ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন: কেন গ্রিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের গভীর নজর?
By আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | ৯ জুলাই ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর আটলান্টিকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে পুনরায় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
তবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ট্রাম্পের এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে পুনর্ব্যক্ত করেছেন, “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।”বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটির প্রায় ৮০ শতাংশই আর্কটিক বৃত্তের ওপরে অবস্থিত।
- প্রায় ৫৬ হাজার মানুষের বসবাসের এই দ্বীপের অধিকাংশ বাসিন্দাই ইনুইট আদিবাসী। দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির আড়ালে থাকা গ্রিনল্যান্ড এখন পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে। এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত অবস্থান, সামরিক গুরুত্ব, নতুন বাণিজ্য পথ এবং বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা।
উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তায় কৌশলগত গুরুত্ব
ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- তার মতে, দ্বীপটি ডেনমার্কের অধীনে থাকার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকলে শুধু আমেরিকার নয়, পুরো পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
অতীতে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিষয়টি কূটনৈতিকভাবেই সমাধান হওয়া উচিত।
আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিযুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের আরেকটি বড় কারণ হলো আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা।
২০১৮ সালে চীন নিজেকে “নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র” হিসেবে ঘোষণা করে এবং “পোলার সিল্ক রোড” প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করে।
- অন্যদিকে রাশিয়া ২০১৪ সালের পর থেকে আর্কটিক অঞ্চলে পুরোনো সামরিক ঘাঁটি আধুনিকীকরণ এবং নতুন বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।ট্রাম্পের মতে, রাশিয়ার নর্দার্ন ফ্লিট এবং উত্তর মেরু অঞ্চলে তাদের সামরিক সক্ষমতা বিবেচনায় গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পিটুফিক স্পেস বেস ও জিআইইউকে গ্যাপ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস (সাবেক থুলে এয়ার বেস) পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র।
- এই ঘাঁটি ক্ষেপণাস্ত্রের আগাম সতর্কবার্তা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী জিআইইউকে (GIUK) গ্যাপ রুশ নৌবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হিসেবে বিবেচিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন বাণিজ্য পথ
বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে। ফলে উত্তর-পশ্চিম সামুদ্রিক পথ (নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ) ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।
- এই নতুন নৌপথ এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের এই বাণিজ্য পথকে ঘিরে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
বিরল খনিজ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনাগ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো এর বিপুল রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ সম্পদ।
স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এসব খনিজ অপরিহার্য।
বর্তমানে বৈশ্বিক রেয়ার আর্থ সরবরাহে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ফলে এই নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
তবে সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে না।
রয়্যাল ডেনিশ ডিফেন্স কলেজের সামরিক বিশ্লেষক থমাস ক্রসবির মতে, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থানের পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে।
অন্যদিকে ডেনমার্ক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থান নেবে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সামরিক সহযোগিতা চুক্তিও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। এদিকে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুউকে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ সমাবেশ করে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিজেদের হাতেই রাখার দাবি জানিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন।