পোশাক রপ্তানিতে বড় ধাক্কা: ৫ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক বিক্রি কমেছে ৮ শতাংশ, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
By নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১১ জুলাই ২০২৬
বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ কমেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা ব্যয় হ্রাস এবং ক্রয়াদেশের ধীরগতির কারণে এ পতন ঘটলেও মে মাসের পরিসংখ্যান নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে।
ওই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (OTEXA)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে।
পাঁচ মাসে রপ্তানি ৩.২৪৫ বিলিয়ন
ডলার ও টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ৫৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ পতন হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণও ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৫ মিলিয়ন স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট (SME)। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিট পোশাকের গড় মূল্য ৩.০৫ ডলার থেকে কমে ২.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে।
মে মাসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
তবে বছরের শুরুতে দুর্বল পরিস্থিতির পর মে মাসে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণও ৭ শতাংশ বেড়েছে।
যদিও ইউনিট মূল্য সামান্য ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বছরের শুরুতে ক্রয়াদেশের যে ধীরগতি ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানিও পুনরুদ্ধারের পথে ফিরতে পারে।
প্রতিযোগীদের তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ
প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম ১.৪৬ শতাংশ, কম্বোডিয়া ১৪.৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়া ৫.৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।অন্যদিকে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে চীন (৪২.৭৫ শতাংশ), ভারত (২৬.৩৭ শতাংশ) এবং পাকিস্তান (১২.৩৫ শতাংশ)। ফলে বৈশ্বিক বাজার সংকুচিত হলেও কিছু দেশ নতুন ক্রয়াদেশ নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হয়েছে।
চীনের বাজার হারানোর সুযোগ কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মে মাসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও এটিকে এখনই স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাবে না।
আগামী কয়েক মাসের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করেই প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের বড় ধরনের পতন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
বাংলাদেশকে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক উৎপাদন, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
কেন কমেছে বাংলাদেশের রপ্তানি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—
* বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের ধীরগতি।
- * উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি।
- * বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সতর্ক ক্রয়নীতি।
- * দ্রুত সরবরাহ ও পণ্যের বৈচিত্র্যে সীমাবদ্ধতা।
- * উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের পরিবর্তে তুলনামূলক কম দামের পোশাকের ওপর নির্ভরতা।
- সামনে কী বার্তা
সামগ্রিকভাবে পাঁচ মাসের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজার এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে বৈশ্বিক বাজার সংকোচনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
তবে মে মাসে রপ্তানির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাক আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই ধারা ধরে রাখতে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন পণ্যে বিনিয়োগ, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ সফল হলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আবারও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।