হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ২৯, ২০২৬

ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডবে ভারতের উত্তর প্রদেশে নির্মাণাধীন সেতু ধসনিহত অন্তত ৬ শ্রমিক, আহত বহু; নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন?

By আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ঢাকা, ২৯ মে ২০২৬ 

IMG_6421

ভারতের উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ ঝড় ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে নির্মাণাধীন একটি সেতু ধসে অন্তত ৬ শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। শুক্রবার ভোরের দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজ শুরু করে পুলিশ, দমকল বাহিনী ও জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক প্রকল্পের অংশ ছিল। কয়েক মাস ধরেই সেখানে নির্মাণকাজ চলছিল। তবে টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া এবং দুর্বল নির্মাণ কাঠামোর কারণে সেতুর একটি বড় অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। সেই সময় নিচে ও ওপরে কাজ করছিলেন বহু শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরের দিকে এলাকায় প্রবল বজ্রপাত ও ঝড় শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেতুর কংক্রিটের অংশ কেঁপে উঠে ভেঙে পড়ে। অনেক শ্রমিক তখন প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ানোর চেষ্টা করলেও সময় পাননি। চারদিকে ধুলো, কংক্রিট ও লোহার রড ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। দেখি সেতুর বড় অংশ মাটিতে পড়ে গেছে। শ্রমিকদের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন।”

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাজুড়ে শোক ও উত্তেজনা তৈরি হয়। নিহতদের বেশিরভাগই দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন অন্য রাজ্য থেকেও কাজের সন্ধানে এসেছিলেন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

এদিকে দুর্ঘটনার পর নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, শুরু থেকেই নির্মাণকাজে অনিয়ম ছিল। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং নিরাপত্তা বিধি অমান্যের অভিযোগও উঠেছে। অনেক শ্রমিকের শরীরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল না বলেও দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও ঘটনাটি নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমালোচনা শুরু করেছে। তাঁদের অভিযোগ, দ্রুত প্রকল্প শেষ করার চাপের কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, বারবার এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও কেন নির্মাণ খাতে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

উত্তর প্রদেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নির্মাণ ত্রুটির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে রাজ্য সরকার।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় বড় নির্মাণ প্রকল্পে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে সেতু, ফ্লাইওভার ও বহুতল ভবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় না রাখলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাঁরা মনে করছেন, শুধু আবহাওয়াকে দায়ী করলে চলবে না; প্রকৌশলগত ত্রুটি ও তদারকির অভাবও তদন্তে সামনে আসতে পারে।

গত কয়েক বছরে ভারতে একাধিক সেতু ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন রাজ্যে নির্মাণাধীন কিংবা পুরনো সেতু ভেঙে প্রাণহানির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ হলেও নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। প্রকল্পে সময়মতো কাজ শেষ করার চাপ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের অভাব এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

দুর্ঘটনাস্থলে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কংক্রিটের স্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে নিহত শ্রমিকদের পরিবারের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারই একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দুর্ঘটনা আবারও ভারতের অবকাঠামো নির্মাণ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসেছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে গতি বাড়ানোর

পাশাপাশি নিরাপত্তা ও গুণগত 

মান নিশ্চিত না করলে এমন 

মর্মান্তিক ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে 

পারে। উত্তর প্রদেশের

এই সেতু ধস শুধু 

একটি দুর্ঘটনা নয়, 

বরং নির্মাণ খাতে জবাবদিহিতা ও 

নিরাপত্তা সংস্কৃতির বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।