তুরাগ হত্যাকাণ্ড: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তুরাগের বুকে কেন লাশ ভাসে?
By শঙ্খচিল
নদী কখনো শুধু নদী নয়। একটি নদী মানে একটি ভূখণ্ডের স্মৃতি, সভ্যতার গল্প, মানুষের কান্না আর সংগ্রামের জীবন্ত ইতিহাস। ঢাকা শহরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে বয়ে চলা তুরাগ নদীও ঠিক তেমনই এক ইতিহাসের নাম। এই নদী শুধু জলরেখা নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের আত্মত্যাগ এবং আজকের তীব্র সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের এক নীরব, রক্তাক্ত সাক্ষী।
একাত্তরের তুরাগ: বেদনার মহাকাব্য
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নির্মম হত্যাযজ্ঞে তুরাগ নদী হয়ে উঠেছিল এক ভয়াবহ বধ্যভূমি।
মিরপুর, গাবতলী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য নিরীহ মানুষ, মুক্তিকামী তরুণ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ এসে ভেসেছিল এই নদীর জলে।
তুরাগের ঢেউয়ে মিশে ছিল স্বজনহারাদের কান্না, মায়ের আহাজারি আর স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গ করা মানুষের তাজা রক্ত। সেই সময় তুরাগ ছিল বাঙালির বেদনার নদী, কিন্তু একই সঙ্গে তা ছিল প্রতিরোধ আর মুক্তির অবিনাশী প্রতীক।
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক: একি নির্মম নিয়তি!
অথচ আজ, স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর, তুরাগের দিকে তাকালে চোখ ফেটে জল আসে।
একাত্তরে তুরাগ রক্তাক্ত হয়েছিল ভিনদেশি শত্রুদের বুলেটে আর বেয়নেটের আঘাতে। আর আজ? আজ তুরাগ রক্তাক্ত হচ্ছে আমাদের নিজেদের হাতে—আমাদের লোভ, ক্ষমতার দম্ভ, নিষ্ঠুরতা আর চরম ঔদাসীন্যে।
আমরা ভেবেছিলাম স্বাধীনতা আমাদের শান্তি দেবে, হানাহানি আর অকালমৃত্যু থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু হে নিয়তি, আজও যখন খবরের কাগজে চোখ রাখি,
কিংবা তুরাগের পাড়ে দাঁড়াই—হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। বিষাক্ত বর্জ্য আর বুড়িগঙ্গা-তুরাগের চেনা কালচে পানির ওপর হঠাৎ ভেসে ওঠে মানুষের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।
তুরাগে আজও ভাসছে রক্তাক্ত লাশ!এই দৃশ্য দেখার জন্য কি এদেশ স্বাধীন হয়েছিল?
যে নদীতে একাত্তরে স্বজন হারানোর আর্তনাদ মিশেছিল, সেই নদীতেই আজ স্বাধীন দেশের মানুষের লাশ ভেসে বেড়ায়। এই নির্মমতা দেখে আজ স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়াতে হয়।
মনের ভেতর এক তীব্র শঙ্কা আর হাহাকার জেগে ওঠে—আমরা কি আবারও ফিরে যাচ্ছি সেই নিরাপত্তাহীন অন্ধকার সময়ের দিকে?
ক্ষমতার নিষ্ঠুর খেলা ও তুরাগের কান্নাআজকের তুরাগ যেন এক দ্বিমুখী যন্ত্রণার প্রতীক। একদিকে কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য নদীটির ধমনিতে রক্ত চলাচল বন্ধ করে একে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিয়েছে; অন্যদিকে সেই বিষাক্ত জলের বুকেই আবার জমা হচ্ছে মানুষের রক্তের দাগ।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তুরাগের দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে ওঠে সাম্প্রতিক এক বিভীষিকায়। রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলায়, ক্ষমতার ঘূর্ণিপাকে পড়ে এই তুরাগের বুকেই ভেসে উঠতে দেখেছি আমরা ছাত্রলীগের সেই ৭টি তরুণের রক্তাক্ত, নিথর দেহ। যে তরুণদের থাকার কথা ছিল পড়ার টেবিলে কিংবা দেশের সেবায়,
তাদেরই কি না ক্ষতবিক্ষত হয়ে অকালে ভেসে যেতে হলো এই নদীর কালচে জলে! এই ৭টি তরুণের রক্তাক্ত লাশ যেন আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক হানাহানি ও মানবিক দেউলিয়াত্বের সবচেয়ে বীভৎস রূপ।
নদীর দিকে তাকালে মনে হয়, একাত্তরের সেই শহীদেরা বুঝি আজ আমাদের এই নৈতিক পতন, এই ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাত দেখে জলের নিচে নীরবে কাঁদছেন।
এক মুমূর্ষু নদীর শেষ গোঙানিযে নদী আমাদের একাত্তরে আশ্রয় দিয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করে এই ঢাকা শহরের প্রাণস্পন্দন সচল থাকে, সেই তুরাগকে আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে গলা টিপে হত্যা করছি। একদিকে চারপাশের অবৈধ দখলদারদের আগ্রাসনে নদীটি শুকিয়ে নালায় পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও মানবিকতার চরম বিপর্যয় একে বধ্যভূমি বানাচ্ছে।
একাত্তরের তুরাগ ছিল উত্তাল, আর আজকের তুরাগ যেন এক মুমূর্ষু মানুষের শেষ গোঙানি।
আমরা কি এতটাই স্মৃতিভ্রষ্ট এবং পথভ্রষ্ট জাতি? যে নদীর জলে আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্ত মিশে আছে, সেই নদীকে আমরা একদিকে ডাস্টবিন বানাচ্ছি, অন্যদিকে লাশের ভাগাড় বানাচ্ছি।
তুরাগের এই মরণদশা আর লাশের উপস্থিতি আসলে আমাদের সামগ্রিক মানবিক ও সামাজিক অবক্ষয়েরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
বিচার চাইছে তুরাগ,
তুরাগ আজ আমাদের কাছে বিচার চাইছে।
একাত্তরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতি আর বর্তমানের এই
তরুণদের লাশের বোঝা বুকে নিয়ে সে আজ আমাদের দিকেই শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
এখনো সময় আছে, আসুন আমরা আমাদের এই ঐতিহাসিক নদীটিকে রক্ষা করি,
রক্ষা করি আমাদের মানবতাকে।
তুরাগের বুক থেকে বিষাক্ত বর্জ্য, দখলের অভিশাপ আর এই নৃশংস রাজনীতির কালো ছায়া দূর করি। তুরাগ আবার তার চেনা রূপে ফিরে আসুক, তার জল আবার স্বচ্ছ ও পবিত্র হোক, তার পাড়ে ফিরে আসুক জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা—এই আমাদের আকুল প্রার্থনা।