তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিন মরদেহ উদ্ধার, পরিচয় নিয়ে উঠে এলো নতুন তথ্য
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | ২৮ জুন ২০২৬
ঢাকার তুরাগ নদ থেকে গত দুই দিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিভিন্ন মহলে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়লেও, পুলিশ বলছে—এ ধরনের অনেক তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন হলেন তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭)। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি গত ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। পরে ২৭ জুন আশুলিয়া থানা এলাকার তুরাগ নদ থেকে তাঁর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শনিবার নিহত সুমনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গেলে শোকাহত স্বজনেরা বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। তাঁরা জানান, মরদেহ শনাক্ত করার পর তাঁরা তা গ্রহণ করেন এবং সন্তানের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় এমন ছবি ও মোবাইল ফোন সরিয়ে ফেলেছেন। পরিবারের দাবি, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাঁরা উদ্বেগে ছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুমন এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি শোভাযাত্রার ভিডিওসহ দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির ভিডিও পাওয়া গেছে।
এদিকে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহতের বড় ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়েছে, সুমন পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন এবং পরে নদীতে পড়ে যেতে পারেন বলে তাঁদের ধারণা। তবে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির পর কয়েকজন নেতা-কর্মী নিখোঁজ হয়েছেন এবং তাঁদের একাধিক মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ পুলিশ এসব দাবিকে ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তুরাগ নদে সাত নেতা-কর্মীর লাশ’ সংক্রান্ত যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন থানা, নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদ থেকে মোট তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রানাভোলার আরিফ হাসান রাকিব এবং রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার রনি মোল্লা।
আরিফের স্বজনরা জানিয়েছেন, তিনিও ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁর মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন—এ তথ্য তাঁরা মৃত্যুর পর অন্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন সকালে আরিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দিয়াবাড়ি এলাকায় গোসল করতে নেমে ডুবে মারা যান রনি মোল্লা। এ ঘটনায় পৃথকভাবে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
রনির বাবা জানান, তাঁর ছেলে উত্তরার একটি হোটেলে কর্মরত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি বলেন, রনির কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না।
তুরাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২২ জুনের পর তাঁদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় একটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ওই সময় এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানও পরিচালিত হয়েছিল।
বর্তমানে তিনটি মৃত্যুর ঘটনাই পৃথকভাবে তদন্তাধীন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে এবং যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য বিশ্বাস না করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।