হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ১৭, ২০২৬

জিয়া হত্যাকাণ্ডে মোজাফফরের ভূমিকা ও ৪৫ বছরের পলাতক জীবন: নানা অমীমাংসিত প্রশ্ন

By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক:

e4115765-2628-4184-b2a0-861c5f3d2e6c

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ওই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন (৭৭) গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বুধবার (১৫ জুলাই) রাত ১০টা ১০ মিনিটে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

পরদিন বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সন্ধ্যায় তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৪৫ বছর পর এই পলাতক কর্মকর্তার গ্রেপ্তার হওয়া কেবল একটি আটক অভিযানই নয়, বরং জিয়া হত্যাকাণ্ডের একাধিক অমীমাংসিত ঐতিহাসিক প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। জিয়া হত্যার মুহূর্তে কাছেই ছিলেন মোজাফফরইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আক্রমণকারী সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের অগ্রভাগে ছিলেন তৎকালীন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।

গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়াউর রহমান যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন মোজাফফর তাঁর খুব কাছেই ছিলেন। মাসকারেনহাসের বর্ণনা মতে, মোজাফফর তখন কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

" তাঁদের দাবি অনুযায়ী, জিয়াকে হত্যা নয়, বরং সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়াই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ঠিক তখনই লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সামনে এসে তাঁর সাবমেশিনগান দিয়ে সরাসরি জিয়াকে গুলি করেন।

সেনানিবাসে ফেরার পথে মোজাফফর আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি জানতেন না যে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হবে।

হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সক্রিয় ভূমিকাজিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার পরও মোজাফফর বিদ্রোহীদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন।

মাসকারেনহাস লিখেছেন, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মোজাফফর, শওকত আলী ও রেজা নামের তিন মেজর আবার সার্কিট হাউসে যান। তাঁরা জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর ডায়েরি, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুর ও অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোজাফফরও জিপে চড়ে পালান। পথিমধ্যে সরকার-অনুগত সেনাদের সাথে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত হলেও মোজাফফর সুকৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর সামরিক আদালতে ১৮ জন কর্মকর্তার বিচার ও ১৩ জনের ফাঁসি হলেও মোজাফফর ও মেজর এস এম খালেদ পলাতক থেকে যান।

দীর্ঘ পলাতক জীবন: ভারত থেকে ব্যাংককমেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোজাফফর দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মইনুল হোসেন চৌধুরী যখন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তখন মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে অপর পলাতক আসামি মেজর খালেদের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তাঁরা রাষ্ট্রদূত মইনুল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গেও একটি গোপন বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তাঁরা দাবি করেছিলেন, জিয়াকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না, বরং সেনাপ্রধান এরশাদ ও শাহ আজিজুর রহমানের মতো স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিবাজদের সরাতে জিয়াকে জিম্মি করে চাপ সৃষ্টি করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।

মইনুল হোসেন চৌধুরী ১৯৯১ সালে ঢাকায় ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এই বৈঠকের বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে ব্যাংককে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মেজর খালেদ। ফলে, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জীবিত সাক্ষী ছিলেন কেবল মোজাফফর।যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলা বাকিমেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে:

পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য: সার্কিট হাউস অভিযানের আসল উদ্দেশ্য কি শুধুই অপহরণ ছিল, নাকি শুরুতেই হত্যার নীল নকশা আঁকা হয়েছিল?

কারাগার বা বিচারিক প্রক্রিয়া: কোর্ট মার্শালের বাইরে থাকা মোজাফফরের বিরুদ্ধে এখন কোন আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

দীর্ঘ পলাতক জীবন: দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে মোজাফফর কার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ভারতে ও বাংলাদেশে আত্মগোপনে ছিলেন?

ছদ্মনাম ব্যবহার করে কীভাবে তিনি সীমান্ত পারাপার করতেন? নেপথ্যের কারিগর:

এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আর কোন প্রভাবশালী মহলের হাত ছিল?

দীর্ঘ সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অনেক রহস্য আজও ধোঁয়াশায় ঢাকা।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোজাফফরকে যথাযথ জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের অনেক অজানা ও চাঞ্চল্যকর সত্য উন্মোচিত হতে পারে।