হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ২০, ২০২৬

ভারতে জনপ্রতিনিধি কেনাবেচা ও দল ভাঙানোর রাজনৈতিক খেলা: আড়ালে কোন রহস্য?

By বিশেষ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ | বেঙ্গল টাইমস, প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬

27a447a1-b8a0-40bb-b793-a987f7b611d1

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতে আজ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেছে।

বহুত্ববাদী সমাজ, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং আইনসভায় বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্বের জন্য যে দেশটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হতো, আজ সেখানে যেন বিরোধী দলগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার এক নজিরবিহীন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করা এবং ক্ষমতাসীন দল বিজেপিতে একীভূত করার একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দল বদল কিংবা বিরোধী দলে থেকেও পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীনদের সমর্থনের পেছনে মূলত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিপুল অর্থের প্রলোভন কাজ করছে বলে খোলাখুলি অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা।

কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপ ও দলবদল

অভিযোগ রয়েছে, সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) মতো কেন্দ্রীয় সংস্থার ভয় দেখিয়ে বিরোধী নেতাদের বাধ্য করা হচ্ছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ রাজনীতিবিদ মদন মিত্র মমতার মূল দল ছেড়ে ‘নতুন’ দলে যোগ দেন; যার ঠিক এক দিন আগেই তাঁর পরিবারকে ইডি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল। একইভাবে তৃণমূলের তিন রাজ্যসভা সদস্য—সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক—বিজেপিতে যোগ দিয়েই দলটির পক্ষ থেকে মনোনয়ন লাভ করেন।

আইনসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ

কেন হঠাৎ এই ঢালাও দল ভাঙানোর হিড়িক? রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করানোর জন্য বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিতেই রাতারাতি একের পর এক বিরোধী সংসদ সদস্যকে ভাঙিয়ে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করছে ক্ষমতাসীন জোট। এমনকি লোকসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে পৃথক দল হিসেবে বসবার স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে।

বিধায়ক ও সংসদ সদস্যদের দরদাম

দল পরিবর্তনের নেপথ্যে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভাঙনের পর প্রতিটি এমপির পেছনে ১৫ থেকে ৫০ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি করা হয়েছিল। এবার পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলছে—বিধায়ক প্রতি ২০ থেকে ৪০ কোটি এবং সংসদ সদস্য প্রতি ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা পর্যন্ত হাঁকানোর অভিযোগ উঠছে। এমনকি মন্ত্রী পদের লোভ ও ১০০ কোটি টাকার প্রস্তাব পাওয়ার দাবিও করেছেন ক্ষমতাসীন দলের বাইরে থাকা জনপ্রতিনিধিরা।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অতীতেও ভারতে রাজনৈতিক কেনাবেচা বা 'হর্স ট্রেডিং' ঘটেছে, যেমনটা ১৯৯৩ সালে নরসীমা রাও সরকারের আমলে দেখা গিয়েছিল। তবে তখন এই অসাধু পদক্ষেপগুলোকে সামাজিকভাবে অত্যন্ত নিন্দনীয় চোখে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে এই অবৈধ বেচাকেনা ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বকে যেন সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভাঙন, দিল্লিতে আম আদমি পার্টির সংকট কিংবা উত্তর প্রদেশ ও তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি—সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে ভয় ও অর্থই এখন ভারতের রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ যেন এক রাজনৈতিক সার্কাস, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিন দিন অর্থহীন করে তোলা হচ্ছে।