ইতিহাসের নিকৃষ্টতম চক্রান্ত: উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংসের সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’
By শঙ্খচিল
–এক আওয়ামী লীগ কর্মীর অন্তরের আর্তনাদ, ক্ষোভ ও ঘুরে দাঁড়ানোর বজ্রশপথএকটি জাতিকে যদি চিরতরে পঙ্গু করে দিতে হয়, তবে প্রথমে তার আত্মপরিচয়ের মূলে কুঠারাঘাত করতে হয়, তার ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে কালিমা লিপ্ত করতে হয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে আমরা বাংলাদেশের বুকে ঠিক সেই নারকীয় ও সুপরিকল্পিত রূপরেখাই বাস্তবায়িত হতে দেখেছি। তথাকথিত আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যা ঘটেছিল, তা কোনো সাধারণ ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ বা গণবিক্ষোভ ছিল না। পর্দার আড়ালে বসে তৈরি হওয়া দেশী বিদেশী কুচক্রী মহলের এক গভীর ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ বা নিখুঁত ষড়যন্ত্রের নীলনকশা ছিল এটি। যার মূল ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর অবিনশ্বর আদর্শকে মুছে ফেলা, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিসাৎ করা এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের রক্তঘাম ছড়ানো পরিশ্রমে গড়া এক আত্মমর্যাদাশীল, উন্নত বাংলাদেশকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ছুড়ে ফেলা।একজন সাধারণ, নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে আজ বুক ফেটে যায়, চোখ নোনা জলে ভিজে ওঠে যখন দেখি—যিনি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে, ১৯ বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে এ দেশের মানুষের ভাগ্যবদল করেছিলেন, তাঁকেই এক জঘন্য চক্রান্তের জাঁতাকলে ফেলে নিজের প্রিয় মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য করা হলো।
মিথ্যার বেসাতি ও ইতিহাসের সুপরিকল্পিত বিকৃতিএই কৃত্রিম আন্দোলনের প্রধানতম অস্ত্র ছিল ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’ বা সুনিপুণ অপপ্রচার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পেইড এজেন্টের মাধ্যমে এমন এক অবাস্তব, কাল্পনিক ও বিষাক্ত মিথ্যার জাল বোনা হয়েছিল, যা আমাদের আবেগী ও তরুণ সমাজকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করেছিল।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—যাঁর একটি তর্জনীর ইশারায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মরণজয়ী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যাঁর বছরের পর বছর জেল জুলুম আর ত্যাগ ছাড়া এই স্বাধীন ভূখণ্ডের কোনো মানচিত্রই তৈরি হতো না, তাঁকে নিয়ে অত্যন্ত নিচু মানের, কুরুচিপূর্ণ ও বানোয়াট কথাবার্তা ছড়ানো হলো।
বাঙালির অহংকার, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি, যা আমাদের স্বাধীনতার সুতিকাগার, সেখানে আগুন দেওয়া হলো! মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কালিমা লিপ্ত করার এক জঘন্য মহা উৎসব চলল দেশজুড়ে।
যে চেতনা আমাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তি, তাকেই বানানো হলো প্রধান আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। একটি জাতিকে সম্পূর্ণ শেকড়হীন ও স্মৃতিভ্রম করার এর চেয়ে বড় এবং নিখুঁত চক্রান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই।শেখ হাসিনার অসামান্য অবদান বনাম অকৃতজ্ঞতার নির্মম রাজনীতিআজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বড় বেদনার সাথে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, জননেত্রী শেখ হাসিনা এই দেশকে কী দেননি? ভঙ্গুর, তলাবিহীন ঝুড়ির তকমাধারী এক ক্ষুদাপীড়িত রাষ্ট্রকে যিনি বিশ্বের বুকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে সগৌরবে দাঁড় করালেন, তাঁর সেই অবদানকে এক নিমেষে অস্বীকার করা হলো?
যোগাযোগের বিপ্লব: নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মার বুকে দৃশ্যমান করলেন বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক পদ্মা সেতু।
ঢাকা শহরের যানজট দূর করতে উপহার দিলেন স্বপ্নের মেট্রোরেল ও উড়ালসড়ক। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পায়রা বন্দরের মতো মেগা প্রজেক্ট দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে ইস্পাতকঠিন শক্তিশালী করেছিলেন।
মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত: পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়ক যা ভাবতেও পারেন না, তিনি তা করে দেখিয়েছেন—আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ গৃহহীন মানুষকে জমিসহ পাকা ঘর উপহার দিয়েছেন। ক্ষুধার্ত দেশকে যিনি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেন, প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিলেন, তাঁর সেই হিমালয় সম মানবিকতা ও উন্নয়নকে এক নিমিষে আড়াল করতে এক সুগভীর চক্রান্তের মাস্টারপ্ল্যান সাজানো হয়েছিল।
আজ দিন যত যাচ্ছে, দেশের মানুষের কাছে তা স্পষ্ট হচ্ছে। এই চক্রান্ত কেবল কোনো সরকার পরিবর্তনের লক্ষে ছিল না। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে আবার সেই একাত্তরের পরাজিত শক্তির হাতে তুলে দেওয়া, পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা এবং মৌলবাদ ও অন্ধকারের যুগে ফিরিয়ে নেওয়া।
নেত্রীর আত্মত্যাগ ও প্রবাস জীবনের অন্তহীন বেদনাশেখ হাসিনা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি এই বাংলার ১৬ কোটি মানুষের পরম আশ্রয়, আমাদের মাতৃতুল্য অভিভাবক।
১৯৮১ সালে যখন তিনি স্বজন হারানোর সুবিশাল বেদনা নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন, তখন থেকেই তাঁর জীবন ছিল বাংলার মানুষের জন্য উৎসর্গকৃত। তিনি নিজের সন্তানদের সময় দিতে পারেননি, নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন কেবল এ দেশের মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য।
আজ যখন তাঁকে আবারও সেই পঁচাত্তরের পর নির্বাসিত জীবনের মতো প্রবাসে কাটাতে হচ্ছে, তখন কোটি কোটি কর্মীর হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। যে মানুষটি দেশের মানুষের ভালো-মন্দের জন্য দিনরাত এক করে খাটতেন, যিনি এক মুহূর্তের জন্যও বাংলাদেশের কথা ভোলেননি, আজ দেশের এই সংকটে তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের কতটা এতিম করে দিয়েছে, তা শুধু একজন সত্যিকারের কর্মীই অনুভব করতে পারেন।যাঁকে বাংলার মানুষ ভালোবেসে 'মাদার অব হিউম্যানিটি' উপাধি দিয়েছিল, আজ তাঁকে ক্ষমতার লোভী কিছু চক্রান্তকারী নিজের চেনা মাটি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কোনো চক্রান্তকারীই বাংলার মানুষের মন থেকে শেখ হাসিনার নাম মুছে ফেলতে পারেনি, পারবেও না।
আমাদের প্রতিজ্ঞা: ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর বজ্রশপথবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোনো ভুঁইফোঁড় বা
পকেট সংগঠন নয় যে সামান্য ঝোড়ো হাওয়ায় ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে।
এই সংগঠন এ দেশের মাটি, মানুষ, কাদা-জল আর দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক অবিনশ্বর আবেগের নাম।
লড়াকু নেত্রী শেখ হাসিনাকে সাময়িকভাবে হয়তো দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু কোটি কোটি কর্মীর হৃদয়ের সিংহাসন থেকে তাঁর স্থান বিন্দুমাত্র নাড়ানো যায়নি।
আমরা আওয়ামী লীগের কর্মীরা সাময়িকভাবে স্তব্ধ হতে পারি, আমাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের স্টিমরোলার চলতে পারে, কিন্তু আমরা দমে যাইনি।
ইতিহাস সবসময়ই নির্মম সত্যকে প্রকাশ করে, মিথ্যাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়।
সময়ের ব্যবধানে এই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ও ষড়যন্ত্রের কুৎসিত কালো মেঘ কেটে যাবেই এবং সত্যের সূর্য আবার উদিত হবে।
আমরা বুক বেঁধে আছি, এই অন্ধকার স্থায়ী হতে পারে না।
জননেত্রী শেখ হাসিনার সেই চিরচেনা উন্নয়ন, শান্তি ও প্রগতির রাজনীতি এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা আবার রাজপথে ঘুরে দাঁড়াবই—ভস্ম থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখির মতো। জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!চিরজীবী হোক জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শ!