"অদৃশ্য যুদ্ধের মানচিত্র"
By ফারহান ইশরাক কাব্য, ইংরেজি বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস।
ঐ যে আমার কলেজের শেষ বেঞ্চে বসা বন্ধুটা যে কিনা জৈব যৌগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল, অস্ত্র হিসেবে ছিল তার হাতে বানানো কয়েকটা কবিতা। জিততে পারেনি সে, সালফিউরিক এসিডের ঝলসানো আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় তার একেকটা কবিতা। আসলে অমলকান্তিরা কখনো জিততে পারে না।
ধুলোয় জমা ডেস্কের সাথেই তাদের কবিতার বয়স বাড়তে থাকে। কেউ তা শোনে না, কেউ তা জানে না। আরেক অমলকান্তিকে চিনতাম, সে এমন আহামরি কেউ না কিন্তু টিফিনের সময় আামাদের সাথে কখনো ঝালমুড়ি খেতে যেতে পারত না। শুনেছিলাম স্কুল তার বেতন মওকুফ করতেও নারাজ। তারপরও প্রায় দেখতাম এলাকার গিটারের দোকানটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার চোখগুলো কেমন জলজল করতো। হয়তো ওগুলোকে বেঁচে থাকার অস্ত্র বানাতে চেয়েছিল। পারেনি যুদ্ধে নামার আগেই হেরে গিয়েছিল সে,
তারপর আমার আরেক বন্ধুর কথাও খুব মনে পড়ে। ঐ যে যার প্রেম কাহিনি পুরো এলাকা জুড়ে বিখ্যাত। কিন্তু তার সেই ভালোবাসায় জড়ানো প্রিয়তমা আজ প্রিয়ট্রমা হয়ে তাকে বড্ড পীড়া দেয়। আবার ঐ যে আমার নানা বাড়ির তাইজুল চাচা, আকাশের বিশ্বাসঘাতকতায় যার সব ফসল মারা গেল, আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। তার কাছে আকাশও আজ মির জাফর।
মায়ের কাছে ছোটবেলায় শুনেছিলাম মেয়েদের যুদ্ধগুলো অন্যরকম হয়। এই যেমন ছোটবেলায় কালো করে এক দূরসম্পর্কের বোন থাকতে এসেছিল আমাদের বাসায়। তাকেও দেখেছিলাম আয়নায় নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। সৌন্দর্যের সব সুশীল ব্যাখ্যা গুলো তীরের মতো আয়নার দিকে ছুড়ে দিলেও, আয়না কেবল বাস্তবতার ধারালো আঘাতে সেই যুদ্ধে জিতে গেল। সেদিন বুঝেছিলাম বাস্তবতার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই।
আবার কয়েকবছর আগে কোনো এক মন খারাপ করা সন্ধ্যায় এক বান্ধবীর তার ছোটবেলার নীল আকাশের কথা শোনাচ্ছিল।
আহা!! কতই না সুন্দর সেই গল্প। চাঁদ, তারা, মেঘ সব মিলিয়ে নিজ হাতে বোনা এক স্বপ্নীল আকাশ। কিন্তু সেই আকাশে প্রায় একগুচ্ছ কালো মেঘ আসত। শুনেছি মেঘ খুব কোমল হয়। কিন্তু সেই মেঘের লোলুপতার ধারে ক্ষতবিক্ষত হতো তার শরীর সেখান থেকে মন। আহত সেই মন নিয়ে আজও ঘরের কোনে নির্ঘুম রাত কাটে তার। আবার বাসের ভিড়ে নিজেকে ভালোবেসে গায়ে শাড়ি জড়ানো সেই মেয়েটা, সে কি পারলো কালো হাত গুলোর সাথে যুদ্ধে জিততে?? কে জানে হয়তো মনের কোনে এখনো দাগ নিয়ে বসে আছে।
আসলে শান্তির এই পৃথিবীতে একমাত্র যুদ্ধই সত্য। কেননা ঐ যে গাজার বাচ্চা ছেলেটা, বিশাল এক মিসাইল যার জন্মদিনটা ভেস্তে দিল। ভাঙা কংক্রিটের মাঝে থেকে তার বাবা আজও হ্যাপি বার্থডের সুর তোলে। সেই রক্ত মাখা সুরগুলো জমা থেকে যায় পৃথীবির বুকে।
হাজার মাইল দুরের সেই মহা বিরক্তিকর মানুষটা যার কাছে পুরো জগত অর্থহীন,
রক্তমাখা সেই সুরের মোহে তার চোখও আজ ভিজে যায়। আসলে যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না।
কখনো মানুষ কখনো জীবন আবার কখোনো দেশের রুপ নিয়ে বারবার ফিরে আসে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিসাইলও সময়ের স্রোত থামাতে পারেনি।
সেই স্রোত আামাদের নিয়ে যায়, ঠেলে দেয় নতুন কোনো যুদ্ধের মুখে।
তাই আমিও বলি
এই শহরের ক্রুদ্ধতায়,
কত শত গল্প হারিয়ে যায়
আমিই এক অভাগা
তাকে আটকে রাখি মায়ায়।