এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থার অবসান: মাত্র ৩৫ বছরেই কেন শেষ যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য?
By বেঙ্গল টাইমস আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে একচ্ছত্র মার্কিন আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল, মাত্র ৩৫ বছরের মাথায় তা আজ খাদের কিনারায়. ওয়াশিংটনের তৈরি করা উদারনৈতিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা আজ ধুলিসাৎ হওয়ার পথে. যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা বিশ্লেষক মার্টিন উলফের এক বিশেষ নিবন্ধে এই চাঞ্চল্যকর ভূরাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ভবিষ্যৎ সংকটের চিত্র উঠে এসেছে.
মার্কিন আধিপত্যের উত্থান ও স্বর্ণযুগ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে রসায়ন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিতে অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে চালকের আসনে বসে যুক্তরাষ্ট্র।
ওই বছরই দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়.দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘ ঠান্ডা লড়াইয়ের পর ১৯৯১ সালে এক মেরুর বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দেয় ওয়াশিংটন।
ফ্যাসিবাদের পর সমাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে সাংবিধানিক সরকার, মুক্তবাজার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের একচ্ছত্র অভিভাবক হয়ে ওঠে তারা. কিন্তু ইতিহাসের সেই পরম গৌরবময় অধ্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি।
পতন ও বিশৃঙ্খলার মূল ৩ কারণমার্টিন উলফের মতে, গত সাড়ে তিন দশকে বিশ্বকাঠামো স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উধাও হয়ে গেছে।
বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তর করার পেছনে কাজ করেছে প্রধানত তিনটি নিয়ামক।
চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উত্থান।
দেং জিয়াওপিংয়ের ‘সংস্কার ও খুলে দেওয়া’ নীতির হাত ধরে চীন
আজ যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ এক শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সংহতিনাশক প্রভাব: ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বায়নকে দ্রুততর করলেও তা একই সঙ্গে তীব্র আর্থিক সংকট এবং গণ-অভিবাসন সমস্যার মতো বড় বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতা ডেকে এনেছে।
দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের জয়জয়কার: বিশ্বজুড়ে রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী প্রতিবিপ্লবের জোয়ার তৈরি হয়েছে, যা উদারনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলছে।
অভ্যন্তরীণ সংকট ও ট্রাম্পের ভূমিকাযুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিনের দ্বারপ্রান্তে এসে খোদ দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে।
প্রশাসন অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার পাশাপাশি মার্কিন জনতা ও নেতৃত্ব তাদের পূর্বপুরুষদের তৈরি আদর্শিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
নিবন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়, স্বাধীনতার যে ঘোষণা একদা জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে মুক্তি এনেছিল, ট্রাম্প নিজেই আজ তেমন এক শাসকের রূপ নিতে চাচ্ছেন।
তিনি মার্কিন ক্ষমতার মূল ভিত্তিগুলো—আইনের শাসন, বিশ্বসেরা বিজ্ঞান, আস্থার মিত্রকূল এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমাগত দুর্বল করছেন, যার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে একটি হঠকারী সরকার।
গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকিআন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ভি-ডেম’-এর পরিসংখ্যান উল্লেখ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে গত দুই দশক ধরে গণতন্ত্র উল্টোপথে হাঁটছে. বর্তমানে পৃথিবীর মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ উদার গণতন্ত্রের সুবিধা ভোগ করছে।
এই পরিস্থিতি বেইজিংয়ের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক প্রকার পরোক্ষ বিজয়.বর্তমানে বিশ্ব একযোগে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে রয়েছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশের বিপর্যয় সামলানো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো বৈপ্লবিক প্রযুক্তির মারাত্মক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা।
- নিরঙ্কুশ স্বৈরশাসনই কি আগামী
- দিনের বৈশ্বিক নিয়মে পরিণত হবে,
- নাকি স্বাধীনতা টিকে থাকবে—
সেই মৌলিক প্রশ্নের মীমাংসা করা।
পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতির কারণে হয়তো পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক যুদ্ধ বা ১৯৩০-এর দশকের মতো সামরিক উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে না, তবে বিশ্ব ব্যবস্থা আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার আবর্তে. ৩৫ বছর আগে সোভিয়েত পতনের পর যে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছিল, তা আজ দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে।