হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুন ২৮, ২০২৬

শহরের শেষ ভরসা: আমাদের একজন মিশু ভাইকে ভীষণ দরকার

By শঙ্খচিল, লেখক, বগুড়া

IMG_7620

বগুড়া শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখনও কিছু মানুষ জেগে থাকেন অন্যের বিপদের প্রহর গুনে। যখন এই যান্ত্রিক শহর স্বার্থের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত, তখনও কেউ কেউ সব হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ান একজন কান্ডারীর মতো। সেই মানুষটির নাম—আমাদের সবার প্রিয় মিশু ভাই।

আজ যখন তাঁর সংকটের খবর শুনি, বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জন্ম নেয়। ভাবি, এই মানুষটির কোন অবদানের কথা বলব, আর কোন ঋণের কথা ভুলে যাব? এমন একজন মানুষের প্রতি এই শহরের ঋণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

মানবতার এক উজ্জ্বল বাতিঘর

মিশু ভাইয়ের দিন শুরু হতো মানুষের উপকার করার মধ্য দিয়ে। কোনো প্রসূতি মায়ের জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে গভীর রাতেও নিজের পকেটের টাকা খরচ করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর কাছে দায়িত্ব নয়, ছিল মানবিকতার স্বাভাবিক প্রকাশ।

নামাজগড় কবরস্থানে কবর জিয়ারত করতে গিয়েও যদি কোনো অসুস্থ বা অসহায় মানুষ তাঁর চোখে পড়েছে, তিনি থেমে গেছেন। খোঁজ নিয়েছেন, প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। মানুষের কষ্ট দেখলে তিনি কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি।

করোনাকালের এক নীরব যোদ্ধা

কোভিড-১৯ মহামারীর ভয়াবহ দিনগুলো কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?

যখন স্বজনেরা নিজেদের প্রিয়জনের মরদেহের কাছেও যেতে ভয় পেতেন, যখন দাফন ও সৎকারের জন্য মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন মিশু ভাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় শত শত মরদেহের দাফন ও সৎকারে তিনি সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

হাসপাতালে শয্যা ছিল না, অক্সিজেনের সংকট ছিল চরমে। সেই সময় অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন বাড়ি থেকে বাড়ি। অসংখ্য মানুষ তাঁর এই মানবিক উদ্যোগে নতুন করে বাঁচার আশা পেয়েছেন।

যেখানেই সংকট, সেখানেই মিশু ভাই

লকডাউনে সাতমাথার মুচি সম্প্রদায়ের মানুষ যখন অনাহারের মুখে, তখন নীরবে তাদের ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। শেখেরকোলায় ত্রাণ বিতরণ, সুবোধ বাজার কিংবা সারিয়াকান্দির দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা—প্রতিটি মানবিক উদ্যোগেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।

যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন—তিনি কখনো পদ-পদবির জন্য কাজ করেননি। মানুষের ভালোবাসাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এক শহরের ঋণ

রুমি নামের একজন মানুষের জীবনের কঠিন সময়ে মিশু

ভাই যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ নিয়তির নির্মম পরিহাসে মিশু ভাইয়ের দুর্দিনের খবর শুনে সেই রুমিও অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এই ঘটনা যেন প্রমাণ করে, একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের ভালোবাসা কত গভীর হতে পারে।

আজ পুরো বগুড়া শহর মিশু ভাইয়ের জন্য প্রার্থনা করছে।

আমাদের আবেদন

এই শহরে হয়তো অনেক বিত্তবান মানুষ আছেন, অনেক প্রভাবশালী মানুষও আছেন। কিন্তু মানুষের দুঃসময়ে নিঃস্বার্থভাবে ছুটে যাওয়ার মতো মানুষ খুব বেশি নেই। মিশু ভাই তাঁদেরই একজন।

তাঁর বিষয়ে যদি কোনো আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তবে সেটি অবশ্যই আইন ও ন্যায়বিচারের আলোকে পরিচালিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের মানবিক অবদানও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

আমাদের একটাই আকুতি—এই শহরের মানবিকতার যে আলো তিনি বছরের পর বছর জ্বালিয়ে রেখেছেন, তা যেন নিভে না যায়।

কারণ, মানবিকতা বাঁচিয়ে রাখতে, বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে—আমাদের একজন মিশু ভাইকে ভীষণ দরকার।