হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ২২, ২০২৬

ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আকাশে বাতাসে।

By কৃষিবিদ দীপু পেশাজীবি ও কলামিস্ট।

78d4529d-af81-4c0f-9ca7-f536819ee69c

বাংলার আকাশ আজকাল খুব ভারী লাগে। বাতাসে কেমন এক অদৃশ্য কান্নার শব্দ ভেসে বেড়ায়। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়—কোথাও কোনো শিশু কাঁদছে। কোনো মা বুক চাপড়ে বলছে, “আমার মেয়েটাকে বাঁচাও।” কোনো বাবা থানার সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আর আমরা? আমরা ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ লিখে, দু’ফোঁটা দুঃখ দেখিয়ে আবার নিজের জীবনে ফিরে যাই।

মাত্র ছয় মাসে কত নাম শুনলাম! আছিয়া, রামিসা, নুসরাত, তানিয়া, অচেনা কত শিশু—যাদের নাম সংবাদপত্রের কয়েক কলামের বেশি জায়গা পায়নি। কিন্তু প্রতিটি নামের পেছনে ছিল একটি ছোট্ট পৃথিবী। ছিল স্কুলব্যাগ, ছিল রঙিন ফিতা, ছিল ঈদের জামার স্বপ্ন, ছিল বাবার কাঁধে চড়ে মেলায় যাওয়ার আনন্দ।

রামিসার কথাই ধরা যাক। যে মেয়েটি হয়তো সেদিনও স্কুলে যাওয়ার আগে আয়নায় নিজের চুল ঠিক করেছিল। মা হয়তো বলেছিলেন, “তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরিস।” কিন্তু সে আর ফেরেনি। ফিরেছে শুধু তার নিথর শরীর, আর এক সমুদ্র কান্না।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—রামিসার বাবা রাষ্ট্রের কাছে বিচার চান না। কারণ তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি মনে করেন, এই দেশে এখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। মানবাধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত। কত কষ্টে, কতটা অসহায়ত্বে, কতটা হতাশায় একজন পিতা তার মেয়ের ধর্ষণকারীর বিচার চাইতেও ভয় পায়—একবার ভাবুন! একজন বাবার বুকফাটা, গগনবিদারী কান্না যেন আজ পুরো জাতিকে জেগে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছে।

বাংলাদেশের মাটিতে এখন ধর্ষণ যেন শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি এক ভয়ংকর সামাজিক মহামারী। শিশুদের নিরাপত্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। স্কুলে, মাদ্রাসায়, বাসায়, রাস্তায়—কোথাও তারা নিরাপদ নয়। যে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙ পেন্সিল, তার শরীরে আজ নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন।

সবচেয়ে ভয়ংকর কী জানেন? আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।

খবর আসে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। মানববন্ধন হয়। টকশো হয়। তারপর সব থেমে যায়। কিন্তু একটি পরিবারের কান্না থামে না। একটি মায়ের বুকের ভেতর আগুন জ্বলতেই থাকে।

এই সমাজে বিচারহীনতা এখন সবচেয়ে বড় অপরাধী। কারণ অপরাধীরা জানে—কিছুদিন পর মানুষ ভুলে যাবে। মামলা ঝুলে থাকবে। সাক্ষী হারিয়ে যাবে। তারপর একদিন খবরের কাগজের পুরোনো পাতার মতো ঘটনাটাও হারিয়ে যাবে।

আমাদের দেশটা তো এমন ছিলনা, জঙ্গি হামলার মাধ্যমে মেটিকুলাস প্লান করে রেজিম চেঞ্জ করার পরে, যে বিচার হীনতার মব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে দখলদার সরকার এর আমলে, সেই সংস্কৃতি ধ্বংস করেছে সমাজব্যবস্থায়, পচন ধরেছে সমাজে। সামাজিক সচেতনতা, প্রতিরোধ ও গনজাগরণ বাঁচাতে পারে আমার দেশমাতৃকাকে।

শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে যখন মানুষ “জাস্টিস ফর রামিসা” ব্যানারে দাঁড়ায়, তখন সেটা শুধু একটি শিশুর জন্য বিচার চাওয়া নয়। সেটি পুরো দেশের বিবেককে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা। একজন শিক্ষক যখন কাঁপা গলায় বলেন, “আর কত?”, তখন সেটি শুধু বক্তৃতা নয়—এটি এক অসহায় জাতির আর্তনাদ।

আমরা একসময় যুদ্ধ করেছি স্বাধীনতার জন্য। আজ আমাদের লড়তে হচ্ছে মানবিকতার জন্য। কারণ যে দেশে শিশু নিরাপদ নয়, সে দেশ কখনো সভ্য হতে পারে না।

ধর্ষকের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, কোনো ক্ষমার অধিকার নেই। যারা শিশুদের জীবন ছিন্নভিন্ন করে, তারা মানুষ নয়—তারা সমাজের বিষাক্ত অন্ধকার।

আজ সময় এসেছে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধ ও গণজাগরণই পারে এই অন্ধকার ভেদ করতে। মানুষকে নীরবতা ভাঙতে হবে। প্রতিবাদকে সংগঠিত করতে হবে। নইলে এই আগুন একদিন পুরো সমাজকে গ্রাস করবে। বাংলার আকাশে ধর্ষিতাদের কাতর চিৎকার শেষ হবেনা, ধর্ষিতা চিৎকার করে কর্ণ বিদীর্ণ করবে, অভিশাপ দিবে, ধিক্কার দিবে আধমরা বলে। 

আর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।