হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ৩১, ২০২৬

শেখ সায়েরা খাতুন: ইতিহাস গড়ার নীরব স্থপতি।

By কৃষিবিদ দীপু পেশাজীবি ও কলামিস্ট।

7a9e359c-97eb-46d5-8f30-88082621ef0f

ইতিহাস সাধারণত রাজা, নেতা, সেনাপতি কিংবা বিপ্লবীদের নাম মনে রাখে। কিন্তু ইতিহাসের পেছনে যে মানুষগুলো নীরবে চরিত্র গড়ে দেন, সাহসের বীজ বপন করেন, মানবিকতার শিক্ষা দেন, তাদের নাম অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। সায়েরা খাতুন ছিলেন তেমনই এক নীরব নির্মাতা।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে উনার জীবন কেটেছে। জন্ম উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, এমন এক সমাজে যেখানে নারীর ভূমিকা ছিল অনেক সীমাবদ্ধ। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে সততা, সাহস, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছিলেন। 

এই শিক্ষাই পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও মানবিক চরিত্রের ভিত গড়ে দেয়।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা পড়লে বারবার মায়ের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। তিনি ছিলেন ছেলের অসুস্থতায় উদ্বিগ্ন, সংগ্রামে চিন্তিত, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার শিক্ষা দেওয়া এক দৃঢ়চেতা নারী। রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে ছেলে যখন বারবার কারাগারে গেছেন, তখন একজন মায়ের হৃদয় নিশ্চয়ই কেঁদেছে। 

কিন্তু তিনি ছেলেকে কখনো ন্যায় ও আদর্শের পথ থেকে সরিয়ে আনতে চাননি।একজন মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো এটাই—তিনি সন্তানের জন্য ভয় পান, কিন্তু তার বিবেককে দুর্বল করে দিতে চান না।বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে সায়েরা খাতুনের নাম কোনো রাজনৈতিক পদ বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত নয়। 

কিন্তু স্বাধীনতার ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর যে অবিচল মানসিক শক্তি, মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং ত্যাগের মানসিকতা—সেই চরিত্র নির্মাণে তাঁর পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের প্রভাব ছিল গভীর।

১৯৭১ সালে যখন বাঙালি জাতি অস্তিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ, তখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। সেই সময় তাঁর পরিবারও ছিল দুঃসহ অনিশ্চয়তার মধ্যে। একজন মা হিসেবে সায়েরা খাতুনকে সেই উদ্বেগ, শঙ্কা এবং অপেক্ষার দীর্ঘ সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই পরিবার ভেঙে পড়েনি।১৯৭৫ সালের ৩১ মে সায়েরা খাতুন মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির মা হিসেবে নয়, তিনি বিদায় নেন একজন সাধারণ বাঙালি মায়ের মতোই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল অসাধারণ। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধুর আবেগপ্রবণ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, তিনি তাঁর মাকে শুধু মা হিসেবেই নয়, নিজের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দেখতেন।আজ, তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা যখন সায়েরা খাতুনকে স্মরণ করি, তখন শুধু একজন মহান নেতার মাকে স্মরণ করি না। আমরা স্মরণ করি সেইসব মায়েদের, যাদের ত্যাগ, ধৈর্য এবং মূল্যবোধ জাতির ইতিহাসকে নীরবে গড়ে দেয়।

একটি জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলবে। কিন্তু সেই নক্ষত্রের আলো যে প্রথম জ্বলে উঠেছিল এক মায়ের ঘরে, এক মায়ের স্নেহে, এক মায়ের শিক্ষায়—সেটিও আমাদের মনে রাখা উচিত।

রত্নগর্ভা মা সায়েরা খাতুন তাই শুধু বঙ্গবন্ধুর মা নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে মাতৃত্ব, ত্যাগ এবং নীরব শক্তির এক অনন্য প্রতীক।

“রত্নগর্ভা” শব্দটি এখানে কেবল একটি উপাধি নয়; এটি এক অনুভব—মায়ের ভেতর লুকানো সেই শক্তির স্বীকৃতি, যা সন্তানের চরিত্র, সাহস এবং মানবিকতাকে গড়ে তোলে। সায়েরা খাতুন ছিলেন সেই শক্তিরই প্রতিচ্ছবি।

আজ আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপিত হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ার সেই মায়ের ঘরেই।

বাঙালির আত্মপরিচয় ও ইতিহাস নির্মাণের নেপথ্যের এই নীরব স্থপতির অবদান চিরকাল অম্লান থাকবে।

শেখ সায়েরা খাতুন এর মৃত্যুবার্ষিকীতে অতল শ্রদ্ধা।