হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ২০, ২০২৬

নারী ও শিশু সুরক্ষার অন্যতম ভরসার প্রতীক — শেখ হাসিনা২০২৪–২০২৬: পরিবর্তিত বাংলাদেশ, বাড়ছে উদ্বেগ।

By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমসতারিখ: ২১ মে ২০২৬

E2FF2EE1-1750-4BD3-8D44-66487BA4FD9F

বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে একটি বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রায়ই আলোচনা হয়— শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোরতা এবং আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত বিচার কার্যক্রম।

বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই সময় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনকে আরও কার্যকর করা, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় রাখা এবং চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। সরকারিভাবে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথাও বারবার উচ্চারিত হয়।

২০২০ সালে দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার জন্য আইন সংশোধন করে। একইসঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়। তৎকালীন সময়ে আইনমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছিলেন, “নারী ও শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

শুধু আইন নয়, সামাজিক সুরক্ষাতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের নিরাপত্তা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী শিক্ষা বিস্তার, নারী সহায়তা কেন্দ্র, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং শিশু সুরক্ষা ইউনিট চালুর মতো কার্যক্রম সেই সময় আলোচনায় আসে।

২০২৪–২০২৬: বাড়তে থাকা উদ্বেগ ও অপরাধ প্রবণতা।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে দেখা যায়— ধর্ষণ, শিশু হত্যা, কিশোরী নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং গণধর্ষণের একের পর এক ঘটনা জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—

  • * ২০২৫ সালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা বেড়ে প্রায় ৭৮৬টি-তে পৌঁছায়।
  • * শিশু ও কিশোরী ভুক্তভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • * ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই শত শত ধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসে।
  • * ২০২৬ সালের শুরুতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং প্রথম দুই মাসেই প্রায় ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, যার বড় একটি অংশ ছিল গণধর্ষণ।
  • * বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শিশু ও কিশোরীরাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সুযোগে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা কিছু ঘটনা

মিরপুরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড

রাজধানীর মিরপুরে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। শিশুটির বাবার একটি বক্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

রামিসার বাবা বলেন-

“১৫ দিন পর সবাই এটা ভুলে যাবে। নতুন একটা ইস্যু আসবে। আবার আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা আসবে। এভাবেই চলতে থাকবে।”

এই বক্তব্য অনেকের কাছে বর্তমান বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা পড়ে।

মাগুরার আছিয়া ধর্ষন ও হত্যা কাণ্ড

২০২৫ সালে মাগুরার ৮ বছরের শিশু আছিয়াকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে যান, দাফন ও পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার নানা দৃশ্য প্রচারিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিচার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।

চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ঘটনা

চট্টগ্রামে শিশু নির্যাতন ও অবহেলায় মৃত্যুর একাধিক ঘটনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কিশোরী নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করে। অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে থাকে।

সামাজিক মাধ্যমে সহিংসতার বিস্তার

২০২৪–২০২৬ সময়ে নারী নির্যাতন ও কিশোরী নিপীড়নের একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এসব ঘটনা সমাজে ভয়, হতাশা এবং অনিরাপত্তার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে।

কঠোর আইন, কিন্তু অপরাধ কেন বাড়ছে?

বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারপরও অপরাধের হার কমার পরিবর্তে কেন বাড়ছে— এই প্রশ্ন এখন সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্রে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই অপরাধ কমে না; কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা, সামাজিক শিক্ষা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা— সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে স্পষ্ট বলা আছে, তদন্ত ১৫ দিনের মধ্যে এবং বিচার ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে বহু মামলায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। প্রশ্ন উঠছে— এই ব্যর্থতার দায় কার?

'

পুলিশ প্রশাসনের? নাকি বিচার ব্যবস্থার?নাকি পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর?

সাধারন জনগন মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে অন্তত আলোচিত অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত অভিযান, গ্রেফতার এবং বিচার কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল।

তাদের ভাষায়—

“নারী ও শিশু সুরক্ষায় শেখ হাসিনা ছিলেন আস্থার প্রতীক।”

তারা আরও বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: 

সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়টি কোনো একক রাজনৈতিক দলের ইস্যু নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক দায়িত্ব।

তাদের ভাষায়—

“দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।”

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, যদি অপরাধ দমনে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।