ক্ষমতা বদলালেও থামেনি রাজনৈতিক সহিংসতা, নতুন সরকারের ছয় মাসে উদ্বেগ: এএফপি
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক
বাংলাদেশে নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি (AFP)।গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
নির্বাচনী প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সহিংসতার অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখনও দেশে সহিংসতার বড় কারণ হয়ে রয়েছে।
ছয় মাসে ৬৬ রাজনৈতিক হত্যার তথ্য
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) জানিয়েছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে অন্তত ৬৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
একই সময়ে পুলিশ হেফাজতে ৬১ জনের মৃত্যু, ১১টি বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং আরও নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি।
এএসকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবু আহমেদ ফয়জুল কবির এএফপিকে বলেন, কারাগার ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে
সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধিকাংশ সূচকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে উন্নত অবস্থানে রয়েছে।মরদেহ
সরকারের দাবি, অতীতের অনেক ঘটনা এখন প্রকাশ্যে আসছে, কারণ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এখন নিরাপদ বোধ করছেন এবং পুলিশকে অভিযোগ জানাতে পারছেন।
নিখোঁজের তিন দিন পর মিলল কিশোরের
এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত জুন মাসে ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সুমন আওয়ামী লীগের একটি সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সমাবেশটি নিষিদ্ধ ছিল।
এরপর তিনি নিখোঁজ হন।তিন দিন পর ঢাকার তুরাগ নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
একই সঙ্গে আরও দুইজনের মরদেহও পাওয়া যায়।সুমনের চাচা জুয়েল বাবু এএফপিকে বলেন, তাদের পরিবার জানতই না যে সুমন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কিচেন মার্কেটে রাতের শিফটে কাজ করতেন।
পরিবারের দাবি, স্থানীয়দের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন যে, সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় তাদের ধাওয়া করা হয়।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্বীকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল, যিনি ওই ঘটনার সঙ্গে আটক সাতজনের পক্ষে আইনি লড়াই করছেন, দাবি করেন—পুলিশ ও স্থানীয় কিছু লোকের তাড়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর কয়েকজনকে বাঁশ দিয়ে মারধর করা হয়।
তার অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।তবে পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুলিশের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রত্যেকটি সহিংস ঘটনার তদন্ত চলছে।
তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বা অন্যান্য কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সেগুলো রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা রয়েছে।বিএনপির দাবি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
বিএনপির মুখপাত্র শায়রুল কবির খান বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়কে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন,
যাতে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পান।
তবে তিনি স্বীকার করেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহিংসতা একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেও সংঘর্ষ
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু বিরোধী দল নয়, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরেও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
গত ৯ জুন স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার দলীয় বৈঠকের সময় ছুরিকাঘাতে নিহত হন।
১২ জুন চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী মাসুদুল হক মোটরচালিত রিকশায় আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন।
এছাড়া ৬ জুলাই সাভারে বিরোধী দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সমাবেশে পেট্রোলবোমা হামলায় চারজন আহত হন।
প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যাকাণ্ড
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি দেশে সাধারণ অপরাধও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসে ১,২৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ জন খুন হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী এএফপিকে বলেন, সরকার যদি জনসমর্থন ধরে রাখতে চায়, তাহলে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।তার মতে, রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সাধারণত দুটি প্রবণতা সহিংসতা বাড়ায়—একটি হলো অবৈধ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা, অন্যটি স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এসব অপরাধের বিচার না হয় এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলতে থাকে, তাহলে সহিংসতার এই চক্র আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। বর্তমান বাংলাদেশে সেই বাস্তবতাই দেখা যাচ্ছে।