গণপূর্তের প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানা ও তামজিদের লুটপাট: ছাড় পায়নি আল্লাহর ঘর মসজিদও!
By বিশেষ অনুসন্ধান ডেস্ক | প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬
গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৫ এর কর্মকর্তা প্রকৌশলী তামজিদ ও রাজিয়া সুলতানা চক্রের একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় পুরো ডিপার্টমেন্ট জুড়ে চলছে কঠোর সমালোচনা এবং কানাঘুষা। সারা বছর জুড়ে বাজেট বা বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে অসংখ্য প্রাক্কলন বা এস্টিমেট বিক্রি করে এই চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে বড় অংকের অর্থ। এই দুর্নীতিবাজ দুষ্টচক্রের লুণ্ঠনের বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি পবিত্র আল্লাহর ঘর মসজিদও।
সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদ উন্নয়ন কাজে হরিলুট
অনুসন্ধানে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) কাজ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজের নামে নজিরবিহীন দুর্নীতি হয়েছে। ভবন নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ না হলেও এবং পাঁচতলা ভবনের ৫ম তলার কাজ চলমান থাকা অবস্থায় ই/এম অংশের কাজগুলো নিয়ে অনেক আগেই পাতানো টেন্ডারের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষেই পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ওটিএম টেন্ডার আইডি নং ১০০২৬৪৬ এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের ১০০০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি করে সিডিউল বিক্রি, জমা ও রেসপন্স দেখিয়ে ‘মেসার্স মামুন অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে এই কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। যার চুক্তিমূল্য ১ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা হলেও এপিপি লিস্ট অনুযায়ী বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। পাতানো টেন্ডারের কারণে ০.১৮% উর্ধ্বদরে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার হলে ১০% লেস দিলে সরকারের প্রায় ১৯-২০ লাখ টাকা সাশ্রয় হতো।
প্রকল্পভিত্তিক অনিয়মের চিত্র
২৫০ কেভিএ জেনারেটর: টেন্ডার আইডি ১০৩৭৪১০ এর মাধ্যমে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে কনট্রাক্ট সাইন করা হয়, যা গেজ বাংলাদেশ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নামমাত্র ৬.৮৫% লেসে পাইয়ে দেওয়া হয়।
৬৩০ কেজি প্যাসেঞ্জার লিফট: টেন্ডার আইডি ১২২০২৫৭ এর মাধ্যমে ৬৩ লাখ ৬ হাজার টাকা বরাদ্দের কাজও একই প্রক্রিয়ায় পছন্দের ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে।
ভিআরএফ ও স্প্লিট এয়ারকুলার সিস্টেম: ৬ কোটি ৭৭ লাখ ৯১ হাজার ১৯৯ টাকায় ভিআরএফ সিস্টেমসহ অন্যান্য কাজের পূর্ণ বরাদ্দ দিয়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে চেক প্রদান করা হয়েছে, যার কোনো হদিস মাঠে নেই।
সাবস্টেশনের মালামাল ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড়/দুই বছর পূর্বে সাবস্টেশনের মালামাল এনে গুদামজাত করা হলেও এতদিন ধরে ওইসব ইলেকট্রিক মালামাল পূর্ণমাত্রায় কর্মক্ষম থাকে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ওয়াকিবহাল মহল। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নামে তিন গ্রুপে ফায়ার এক্সটিংগুইসার সরবরাহ ও স্থাপন (প্রতি গ্রুপে বরাদ্দ ৫ লাখ ২১ হাজার টাকা), ১টি ১০০০ কেজি ফায়ার কাম প্যাসেঞ্জার লিফট (বরাদ্দ ২ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা), ফোর্স ভেন্টিলেশন সিস্টেম (বরাদ্দ ১ কোটি ৯৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা), সোলার সিস্টেম সার্ফ প্রটেকশন ও বিশেষ আলোকসজ্জাকরণসহ বিভিন্ন কাজ নামমাত্র প্রতিযোগিতায় পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
‘তামজিদের সুলতানা’ ও পার্সেন্টেজ বাণিজ্য
প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানা পার্সেন্টেজ বাণিজ্য ও লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য খুলে বসেছেন তার সাবডিভিশনে। বেপরোয়া ও সর্বগ্রাসী ঘুষ বাণিজ্যের কারণে ভুক্তভোগী ঠিকাদারগণ তাকে ‘তামজিদের সুলতানা’ বলে অভিহিত করে থাকেন। এই সাবডিভিশনের আওতায় কাজপ্রাপ্ত বেশিরভাগ ঠিকাদারকেই ফাইলে বা মাঠে গিয়ে কাজ করতে হয় না; বরং কাজ বাবদ ৫০% বা এর চেয়েও বেশি টাকা ঘুষ হিসেবে আদায় করে থাকেন এই প্রকৌশলী।
এর আগে রংপুর ডিভিশনে কর্মরত থাকাকালীন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নোভো থিয়েটারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ই/এম কাজে সিডিউল বহির্ভূতভাবে নিম্নমানের কাজ করিয়ে এবং প্রকৌশলগত ফাঁকফোকরে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন মহল।
প্রতিবেদক: বিশেষ প্রতিনিধি, বেঙ্গল টাইমস
সূত্র: অনুসন্ধানী দল ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারগণের বক্তব্য।