হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুন ২৪, ২০২৬

পদ্মা সেতুর পিলারের চারপাশে মাটি অপসারণ: জাতীয় অবকাঠামো নিরাপত্তা ও জননীরবতার ট্র্যাজেডি

By লেখক: অধ্যাপক ড.শবনম জাহান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।

IMG_7453

একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভৌগোলিক সংযোগ এবং নাগরিকদের জীবনমান অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী ও টেকসই অবকাঠামোর ওপর। গত এক দশকে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, যা দেশের উন্নয়নের চিত্রই বদলে দিয়েছে। পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করেছে, বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে এবং লাখো মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।এসব অর্জনের মধ্যে পদ্মা সেতুর স্থান বিশেষ। এটি শুধু ইস্পাত ও কংক্রিটের একটি স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় গৌরব, আত্মনির্ভরতা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের আশার প্রতীক।অবকাঠামো উন্নয়ন কেন গুরুত্বপূর্ণটেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়ন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা যাতায়াতের সময় কমায়, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাস করে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করে। উন্নত সংযোগ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করে।এই সুবিধা শুধু বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক, জেলে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষও উন্নত যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সুযোগের সুফল ভোগ করেন। বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলো যখন দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন জাতীয় উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য হয়ে ওঠে।পদ্মা সেতু কীভাবে দক্ষিণ বাংলার চিত্র বদলে দিয়েছে১. কৃষি ও মৎস্যখাতের বিকাশবরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ। আগে পরিবহন বিলম্বের কারণে দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হতো। এখন মাছ, শাকসবজি, ফলমূল ও কৃষিপণ্য দ্রুত দেশের বড় বাজারগুলোতে পৌঁছাতে পারছে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমেছে এবং আয় বেড়েছে।২. শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানউন্নত যোগাযোগব্যবস্থা দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ শিল্প, লজিস্টিকস, হালকা প্রকৌশল এবং উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এই অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বড় শহরমুখী জনস্রোত কিছুটা কমছে।৩. পর্যটনের প্রসারকুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত, গুঠিয়া মসজিদ এবং বরিশালের ভাসমান পেয়ারার বাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখন সহজে পৌঁছানো যায়। পর্যটক বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও হস্তশিল্প খাত উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হচ্ছে।৪. স্বাস্থ্যসেবায় সহজ প্রবেশাধিকারপদ্মা সেতু ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে পৌঁছানোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীদের দ্রুত স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে, যা অসংখ্য জীবন বাঁচাতে সহায়ক হতে পারে।৫. শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নশিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও পেশাজীবীদের যাতায়াত সহজ হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ শিক্ষক আকর্ষণ করতে পারছে এবং শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও সহজে পাচ্ছে।পদ্মা সেতুর আবেগিক গুরুত্বকোটি মানুষের কাছে পদ্মা সেতু শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির প্রতীক। পরিবারগুলোকে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য পরিবহন করতে পারেন এবং রোগীরা অনিশ্চয়তা ছাড়াই চিকিৎসার জন্য যাতায়াত করতে পারেন।এই সেতু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ এবং দৃঢ়তার এক অনন্য স্মারক।পিলারের চারপাশে মাটি অপসারণের উদ্বেগজনক বিষয়সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পের কিছু পিলারের আশপাশ থেকে মাটি অপসারণ করা হয়েছে। যদি এ ধরনের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।কোনো সেতুর ভিত্তি আশপাশের মাটির স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। পিলারের কাছে অননুমোদিত খনন বা মাটি অপসারণের ফলে নিম্নোক্ত ঝুঁকি দেখা দিতে পারে—* মাটিক্ষয় ও ভূমির অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি* ভিত্তির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি* রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি* সড়ক ও রেল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি* দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর দুর্বলতাজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড দ্রুত তদন্ত ও প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।জননীরবতা কেন বিপজ্জনকসম্ভাব্য মাটি অপসারণের ঘটনাটির চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো জনগণের উদাসীনতা।গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু জাতীয় অবকাঠামো কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; এটি পুরো জাতির সম্পদ। সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা বন্দর—সবই জনগণের অর্থে নির্মিত এবং সবার কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।যখন মানুষ এসব সম্পদের ক্ষতির বিষয়ে নীরব থাকে, তখন—* অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে* জবাবদিহিতা দুর্বল হয়* ভবিষ্যতে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে* জনগণের আস্থা কমে যায়* জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়একটি দায়িত্বশীল সমাজ জাতীয় সম্পদের ক্ষতির বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে না।আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগপরিবেশগত প্রভাবনিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাটি অপসারণ নদীতীর ভাঙন বাড়াতে পারে এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।অর্থনৈতিক ক্ষতিগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি হলে মেরামতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, যা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের অর্থ থেকেই আসে।জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়সেতু, রেলপথ, বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব স্থাপনার ক্ষতি বা অবহেলা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।আন্তর্জাতিক সুনামবৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা অর্জন করেছে। এসব সম্পদ রক্ষা করা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখা এবং দেশের উন্নয়নের সুনাম ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।কী করা উচিত?নজরদারি জোরদার করা* উন্নত সিসিটিভি স্থাপন* ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত পরিদর্শন* প্রকৌশলগত মূল্যায়ন বৃদ্ধি* ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুকঠোর আইন প্রয়োগ* অভিযোগ দ্রুত তদন্ত* দায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনা* অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করাজনসচেতনতা বৃদ্ধি* জাতীয় সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষিত করা* সন্দেহজনক কার্যকলাপ রিপোর্ট করতে উৎসাহিত করা* শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাস্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণবড় প্রকল্পের আশপাশে বসবাসকারী জনগণকে অবকাঠামো সুরক্ষার অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে। তাদের সহযোগিতা অস্বাভাবিক বা অননুমোদিত কার্যক্রম শনাক্ত করতে সহায়ক হবে।জাতীয় সম্পদের রাজনীতিকরণ বন্ধজাতীয় অবকাঠামো কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া উচিত নয়। যে সরকারই প্রকল্প বাস্তবায়ন করুক না কেন, তা রক্ষা করা সবার যৌথ দায়িত্ব।উপসংহারপদ্মা সেতু শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক। এটি মানুষের জীবনমান উন্নত করেছে, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশের কোটি মানুষকে অর্থনীতির মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করেছে।যদি পিলারের চারপাশ থেকে মাটি অপসারণের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে জাতীয় সম্পদের ক্ষতির বিষয়ে নীরবতা ও উদাসীনতার সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে।জাতীয় অবকাঠামো রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের যৌথ দায়িত্ব। সতর্কতা, জবাবদিহিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্জনগুলো সুরক্ষিত রাখতে এবং একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।