রাজধানীতে হকার ছয় লাখ, বৈধভাবে বসার সুযোগ মাত্র চার হাজারের
By নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে হকারদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে বাস্তবতা হলো, ঢাকায় হকারের বিপুল সংখ্যার তুলনায় নির্ধারিত স্থানের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ফলে উদ্যোগটি বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দুই সিটি করপোরেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে ছয় লাখেরও বেশি হকার জীবিকা নির্বাহ করছেন। অথচ নীতিমালা মেনে এখন পর্যন্ত মাত্র চার হাজারের মতো হকারের জন্য বসার জায়গা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে বাকি বিপুলসংখ্যক হকার কোথায় ব্যবসা করবেন, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরকারের প্রণীত হকার নীতিমালা-২০২৬ অনুসারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ করেছে। রমনা ভবনের পাশের সড়কে ৪০০, বায়তুল মোকাররম এলাকায় ৪৫০, ফুলবাড়িয়ায় ১৫০, নিউমার্কেট দক্ষিণ গেটে ২৫০ এবং বটতলা থেকে বিজিবি গেট পর্যন্ত এলাকায় ১০০ জন হকারকে বসার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ডিএসসিসি এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ হকারকে অন্তর্ভুক্ত করা গেছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও প্রায় দুই হাজার হকারের জন্য স্থান নির্ধারণ করেছে। তবে উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে এই সংখ্যা মোট হকারের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
নতুন জায়গা খুঁজছে সিটি করপোরেশন
ডিএসসিসি আরও কয়েকটি স্থান চিহ্নিত করেছে, যেখানে ভবিষ্যতে হকার বসানো হতে পারে। মতিঝিলের বিভিন্ন সড়ক, এজিবি কলোনি সংলগ্ন এলাকা, ইসলাম চেম্বারের পেছনের রাস্তা এবং শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির আশপাশে কয়েকশ হকারের বসার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এসব স্থান যুক্ত করলেও সর্বোচ্চ দুই হাজার অতিরিক্ত হকারের বেশি পুনর্বিন্যাস করা যাবে না।
এদিকে ডিএনসিসি মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকায় নতুন করে হকার বসানোর পরিকল্পনা করছে। তবুও উত্তর সিটি এলাকায় প্রায় দুই লাখ হকারের জন্য পর্যাপ্ত স্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নৈশ মার্কেট নিয়ে নতুন ভাবনা
হকার ব্যবস্থাপনায় নতুন সমাধান হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নৈশ মার্কেট চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নির্ধারিত এলাকায় হকাররা ব্যবসা করতে পারবেন।
এ জন্য সোলার লাইটের ব্যবস্থা হকারদের নিজেদের করতে হবে। সিটি করপোরেশন মোবাইল টয়লেট, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং অন্যান্য সহায়ক সুবিধা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এ ধরনের নৈশ মার্কেট চালু করা গেলে অন্তত এক-চতুর্থাংশ হকারকে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
রমনা, মতিঝিল, মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও, ওয়ারী, লালবাগ ও গুলশান এলাকায় নৈশ মার্কেট স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি পূর্বাচলেও একটি বড় নৈশ মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্ধারিত সীমানা মানছেন না অনেক হকার
যেসব এলাকায় রং দিয়ে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসব স্থানে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। গুলিস্তান, রমনা ও আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে, নির্ধারিত সীমার বাইরে ফুটপাত ও সড়কের অংশ দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক হকার।
কয়েকজন হকারের অভিযোগ, নির্ধারিত স্থানে বিক্রি কম হওয়ায় তারা সেখানে বসতে আগ্রহী নন। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, কোথায় বসতে হবে সে বিষয়ে তারা পরিষ্কার নির্দেশনা পাননি।
কার্যকর সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, শুধুমাত্র স্থান নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একা সব সময় নজরদারি করতে পারে না। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকার হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। অতীতে বহু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। এবার পুনর্বাসনের পরিবর্তে হকারদের নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু জায়গা নির্ধারণ করলেই হবে না, প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকান্দার হায়াৎ বলেন,
হকার সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য
আলাদা আইন প্রণয়ন জরুরি।
বিশ্বের অনেক দেশেই এ
ধরনের আইন রয়েছে।
সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।