তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পরও খুলল না শ্রমবাজার, ২ লাখ ৪২ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠালো কুয়ালালামপুর
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক, ঢাকা | ৯ জুলাই ২০২৬
মালয়েশিয়ায় নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে এখনও কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং দেশটি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করে গত এক বছরে বিশ্বের ১১২টি দেশের ২ লাখ ৪২ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ও অভিবাসন সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দেওয়ান রাকইয়াতে দেশটির স্বরাষ্ট্র উপমন্ত্রী শামছুল আনোয়ার নাসারাহ জানান, মাইগ্র্যান্ট রিপ্যাট্রিয়েশন প্রোগ্রাম-এর আওতায় ২০২৫ সালের ১৫ মে থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১১২টি দেশের ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৩ জন অবৈধ অভিবাসীকে নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করা হয়েছে।
এ কর্মসূচিতে মোট ২ লাখ ৬৪ হাজার ১৯১ জন বিদেশি নিবন্ধন করেছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইতোমধ্যে নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এই তথ্য প্রকাশের পর বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও শ্রমবাজারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলেও, সফরের পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
একইভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ হওয়ার সুযোগ বা বিশেষ কোনো দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার ঘোষণাও পাওয়া যায়নি।ফলে বহু কর্মপ্রত্যাশী বাংলাদেশি এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রে দুই দেশের আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই বর্তমান তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বলা যায়, সফরের পরও প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
এদিকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখেছে মালয়েশিয়া। স্বরাষ্ট্র উপমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে ৫ হাজার ৪৭০টি অভিবাসনবিষয়ক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৭৬ হাজার ৬০৮ জনের কাগজপত্র ও বৈধতা যাচাই করা হয়।
বিদেশিদের বসবাস বেশি এমন এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়ে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পাইকারি বাজার ও আবাসিক এলাকায় ২ হাজার ৫২৮টি পরিদর্শন চালানো হয়েছে।
এছাড়া পুলিশ, জাতীয় নিবন্ধন বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে ৪৭০টি যৌথ অভিযান এবং বিদেশিদের অবৈধ ব্যবসা দমনে আরও ৭১টি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। একই অধিবেশনে মালয়েশিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অপরাধমূলক মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
২০২৩ সালে ৩৭৮টি, ২০২৪ সালে ৪০৭টি এবং ২০২৫ সালে ৪৬৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও ১২ থেকে বেড়ে ২২টিতে পৌঁছেছে।অন্যদিকে, ইন্ডিপেনডেন্ট পুলিশ কন্ডাক্ট কমিশন (আইপিসিসি)-এ দায়ের হওয়া অভিযোগের সংখ্যা ২০২৩ সালের ১০০টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩৮৮টিতে উন্নীত হয়েছে।
তবে সরকার বলছে, ২০২৩ সালে কমিশন গঠনের পর অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসায় এ পরিসংখ্যান সেই প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা উচিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রদ্রোহ (সেডিশন) আইন এখনও কার্যকর থাকবে।
তবে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া এ আইনে কাউকে অভিযুক্ত করা হবে না।
জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো, সহিংসতায় উসকানি, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে পারে—এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেই আইন প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। কিন্তু নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত থাকা এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণে হাজারো বাংলাদেশি কর্মপ্রত্যাশী ও প্রবাসী অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
ফলে দুই দেশের চলমান কূটনৈতিক আলোচনার বাস্তব ফলাফল কী হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।