শিগগিরই হচ্ছে না নবম পে-স্কেল, বাস্তবায়ন পিছিয়ে যেতে পারে দুই বছর
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক, ঢাকা | ২৮ জুলাই ২০২৬
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে-স্কেল শিগগিরই ঘোষণা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার আগে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজস্ব ঘাটতি, সীমিত আয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। বিষয়টি নিয়ে সরকারও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার সময় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আর্থিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি ব্যয়, রাজস্ব আদায়, প্রস্তাবিত পে-স্কেলের আর্থিক প্রভাব এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেন।কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আইএমএফের অবস্থান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরকারি বেতন ও ভাতা বাজেটিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আইএমএফ মনে করছে, বর্তমান রাজস্ব কাঠামো দিয়ে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি বহন করা কঠিন। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ায় আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে নতুন পে-স্কেল চালু করলে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
কমিটি তৈরি করেছে সংশোধিত প্রস্তাব
তবে সরকার নবম পে-স্কেলের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি সংশোধিত কাঠামো তৈরি করেছে।
প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, আর্থিক চাপ কমাতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন অথবা বিকল্প পদ্ধতির বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। অক্টোবরে আইএমএফের বৈঠকের আগেই এ বিষয়ে কৌশল চূড়ান্ত হতে পারে।
কী আছে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবে?
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী—
* সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- * সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।
- * বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- * যাতায়াত ভাতা সংশোধন ও অন্যান্য ভাতা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়েছে।
- কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ হয়নি। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
তবে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে।
এতে বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।