পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বট বাহিনী’ ব্যবহার করে ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ নেতানিয়াহুর।
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক | আন্তর্জাতিক বিভাগ | ২৯ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে শুরু হয়েছে “ডিজিটাল যুদ্ধ” নিয়ে বিতর্ক। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান সংগঠিতভাবে অনলাইনে “বট বাহিনী” ব্যবহার করে ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে Netanyahu দাবি করেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ, ভিডিও, পোস্ট ও ট্রেন্ডের পেছনে “সমন্বিত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক” কাজ করছে, যার বড় অংশ পাকিস্তানভিত্তিক। তাঁর ভাষায়, “এটি কেবল সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা নয়; এটি পরিকল্পিত তথ্যযুদ্ধ।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও পাকিস্তান সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ স্বীকার করেনি, দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; সাইবার স্পেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এখন ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, জনমত গঠন, তথ্য বিভ্রান্তি এবং ডিজিটাল প্রভাব বিস্তার এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কী বললেন নেতানিয়াহুর? সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সাইবার ইউনিট সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলো একই ধরনের বার্তা, ভিডিও এবং রাজনৈতিক কনটেন্ট একযোগে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এসব অ্যাকাউন্টের অনেকগুলো পাকিস্তানভিত্তিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করতে “স্বয়ংক্রিয় বট সিস্টেম” ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো, বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানো এবং আবেগপ্রবণ কনটেন্ট ভাইরাল করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন
“আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নই। কিন্তু যখন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ঘৃণা, বিভ্রান্তি এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়, তখন সেটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না এলেও দেশটির কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে মনোযোগ সরাতেই এই ধরনের অভিযোগ তুলছে।
পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মানুষের আবেগ ও সমর্থনকে “বট কার্যক্রম” হিসেবে দেখানো বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েল মূলত আন্তর্জাতিক অনলাইন জনমতে নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে যুদ্ধ, মানবাধিকার এবং বেসামরিক হতাহতের প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ও আধুনিক যুদ্ধ
বিশ্ব রাজনীতিতে “ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা” এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন দেশ, রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী সংগঠন অনলাইনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বট, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং অ্যালগরিদমিক প্রচারণা ব্যবহার করে বলে বহুবার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বট অ্যাকাউন্ট সাধারণত স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট বার্তা প্রচার করে, পোস্ট শেয়ার করে কিংবা কোনো হ্যাশট্যাগকে দ্রুত ট্রেন্ডে তুলতে সহায়তা করে। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে একটি বিষয় “জনপ্রিয়” বা “বিশ্বজনীন মতামত” হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে তথ্যযুদ্ধ অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত সামরিক যুদ্ধের মতোই প্রভাব ফেলতে সক্ষম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি এবং প্রতিপক্ষকে দুর্বল দেখানোর কৌশল এখন কূটনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
নেতানিয়াহুর অভিযোগের পর আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করছেন, বিভিন্ন দেশ অনলাইনে “প্রভাব অভিযান” চালায়—এটি এখন আর নতুন কিছু নয়। তবে নির্দিষ্টভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ আনা হলে তা কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, “বট” ইস্যুকে কেন্দ্র করে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত না করা হয়। অনেক সময় সরকারগুলো সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমন করতেও “ভুয়া প্রচারণা”র অভিযোগ ব্যবহার করে থাকে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাবিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন Meta, X এবং Google অতীতে বিভিন্ন দেশভিত্তিক ভুয়া নেটওয়ার্ক অপসারণের দাবি করেছে। এসব প্ল্যাটফর্ম নিয়মিতভাবে “Coordinated Inauthentic Behavior” শনাক্ত করার কথা বললেও সমালোচকরা বলছেন, এখনও অনেক নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে সক্রিয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ভবিষ্যতে বট ও ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাই আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও তথ্যযুদ্ধ
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, অনলাইন প্রচারণাও তত তীব্র হচ্ছে। একদিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা ও সামরিক অবস্থান তুলে ধরছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী গোষ্ঠীগুলো মানবিক সংকট ও বেসামরিক হতাহতের বিষয় আন্তর্জাতিকভাবে সামনে আনছে।
এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক ধরনের “ভার্চুয়াল যুদ্ধক্ষেত্রে” পরিণত হয়েছে, যেখানে ভিডিও, ছবি, হ্যাশট্যাগ এবং লাইভ সম্প্রচার মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, Netanyahu’র সাম্প্রতিক অভিযোগ সেই বৃহত্তর তথ্যযুদ্ধেরই অংশ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো শুধু সামরিক শক্তি নয়, ডিজিটাল প্রভাব নিয়েও প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
ভবিষ্যৎ কী?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই অভিযোগের ফলে ইসরায়েল-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। যদিও দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবুও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে উভয় দেশের অবস্থান প্রায়ই মুখোমুখি হয়ে পড়ে।
এদিকে সাইবার নিরাপত্তা ও অনলাইন প্রভাব অভিযান নিয়ে
বৈশ্বিক উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের
ডিজিটাল প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার
পাশাপাশি সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি
প্রভাব ঠেকাতে নতুন
আইন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের
ভূরাজনীতিতে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি “তথ্য” এবং “অ্যালগরিদম”ও বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর সেই
বাস্তবতায় নেতানিয়াহুর এই অভিযোগ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং আধুনিক ডিজিটাল যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।