কোরবানির বর্জ্য অপসারণে গাফিলতিঢাকার দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর।
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস | ঢাকা, ২৯ মে ২০২৬
রাজধানী ঢাকায় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশুবর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণ না হওয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সরকারি সূত্র জানায়, বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন— ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জোন-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জোন-১ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির। দুজনই উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তাদেরকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে কোরবানির পশুর বর্জ্য দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
নিজেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রী
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকা পরিদর্শন করেন বলে জানা গেছে।
পরিদর্শনকালে হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রীনরোড, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকায় পশুর বর্জ্য, রক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত আবর্জনা এবং আগের জমে থাকা ময়লার স্তূপ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কিছু এলাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের উপস্থিতিও ছিল সীমিত।
এসব দৃশ্য দেখে প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ঈদ উপলক্ষে রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে আগে থেকেই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কোরবানির দিন ও পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পশুবর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
জনদুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
ঈদের সময় রাজধানীতে পশুবর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব, ড্রেনেজ সংকট এবং পরিবেশ দূষণ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বর্জ্য পড়ে থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে পশুর নাড়িভুঁড়ি ও রক্ত পড়ে ছিল। কোথাও কোথাও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এলেও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও যানবাহনের অভাবে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ফার্মগেট এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, “ঈদের পরদিন সকালেও সড়কের পাশে পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখেছি। দুর্গন্ধে দোকান খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল।”
কারওয়ান বাজার এলাকার কয়েকজন পথচারী অভিযোগ করেন, বৃষ্টির পানি ও পশুবর্জ্য মিশে পরিবেশ আরও অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। এতে চলাচলেও দুর্ভোগ তৈরি হয়।
কঠোর বার্তা দিতে চায় সরকার
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে— জনসেবার ক্ষেত্রে গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না।
বিশেষ করে রাজধানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরই সিটি করপোরেশনগুলো ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানালেও বাস্তবে অনেক সময় সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে।
প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই সিদ্ধান্ত অন্য কর্মকর্তাদের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি হলে এখন সরাসরি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে।”
বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ
শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দায়িত্বে অবহেলা, তদারকির ঘাটতি এবং বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমে ব্যর্থতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, গুরুতর অবহেলার প্রমাণ মিললে চাকরিচ্যুতি বা অন্যান্য প্রশাসনিক শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।
এদিকে সিটি করপোরেশনের ভেতরেও এ ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নামানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, রাতভর বর্জ্য অপসারণ কার্য
ম চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় এখনও পশুবর্জ্য পড়ে আছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিছু এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটানো এবং দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অতীতের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তুলনানগর বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই বলছেন, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার রাজধানীতে কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম নিয়ে বেশি সমালোচনা দেখা গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়াদকালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে অধিক সমন্বিত ও দৃশ্যমান কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করছেন।
তৎকালীন সময়ে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আগাম প্রস্তুতি, ওয়ার্ডভিত্তিক মনিটরিং, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, জীবাণুনাশক ছিটানো এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিশেষ টিম গঠনের মতো পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পশুবর্জ্য অপসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও তুলনামূলক সফলতা দেখা গিয়েছিল বলে নগরবাসীর একাংশের অভিমত।
বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় ঈদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শেষ করার বিষয়টি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছিল। অনেক নাগরিক মনে করেন, মাঠপর্যায়ে তদারকি ও সমন্বয় শক্তিশালী হওয়ায় তখন নগর ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর গতি তৈরি হয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা টেনে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয়— এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া রাজধানীর মতো বৃহৎ নগরে কার্যকর পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে “দৃষ্টান্তমূলক” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এমন পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, শুধু দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না। তাদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা, জনবল সংকট এবং পরিকল্পনার দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে সামগ্রিকভাবে জনমনে এই বার্তাই গেছে যে, রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবার প্রশ্নে সরকার আপসহীন অবস্থান নিতে চায়।
নাগরিক প্রত্যাশা
রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসনিক এই পদক্ষেপের পর নগর ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর পরিবর্তন আসবে। শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষ করে ঈদের মতো বড় উৎসবের সময় নগর পরিচ্ছন্ন রাখতে আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর মনিটরিং এবং দ্রুত সমন্বয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সরাসরি তদারকি এবং অবহেলার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনায় এখন সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।