মেটিকুলাস ডিজাইন ও আবু সাঈদ অধ্যায়: একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ
By শঙ্খচিল লেখক, কলামিস্ট
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে যে নজিরবিহীন সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা কি কেবলই সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছিল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল রাষ্ট্র ও একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারকে ধ্বংস করার গভীর কোনো নীলনকশা বা 'মেটিকুলাস ডিজাইন'? ঘটনার দুই বছর পর আজ ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রশ্নটিকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। বিশেষ করে, এই আন্দোলনের তথাকথিত ‘আইকন’ বা প্রতীক বানিয়ে যাকে সামনে রেখে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করে দেওয়া হয়েছিল, সেই আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা এবং তার পরবর্তী অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডগুলো এখন এক ভিন্ন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে।
আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে, কোটা আন্দোলনকে মুখরোচক হিসেবে ব্যবহার করে দেশে একটি সুপরিকল্পিত বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর বিদেশি মিত্ররা। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার সংযম প্রদর্শন এবং আদালতের মাধ্যমে কোটা সমস্যার যৌক্তিক সমাধানের পথ উন্মুক্ত করার পরও, আন্দোলনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চরম সহিংস রূপ দেওয়া হয়। আর এই সহিংসতার মূল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুকে।
অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনাটিকে এমনভাবে প্রোপাগান্ডা আকারে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ মানুষের আবেগ ও ক্ষোভকে উস্কে দেয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফরেনসিকের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আগ্নেয়াস্ত্র বা পুলিশের রাইফেলের সরাসরি গুলি মানুষের গায়ে লাগলে শরীর তাৎক্ষণিকভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, চামড়া ও মাংসপেশিতে স্পষ্ট গভীর ছিদ্র তৈরি হয় এবং ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সেই স্থানে বা রাস্তায় প্রচুর রক্ত পড়ে থাকার কথা এবং নিহতের পরিহিত পোশাকে রক্তের বড় ধরনের দাগ ও ছোপ থাকার কথা। কিন্তু আবু সাঈদের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং পারিপার্শ্বিক আলামতে এই ধরনের কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ মেলেনি, যা কোনোভাবেই একতরফা পুলিশি বর্বরতার দাবিকে বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থন করে না। তদন্তে বরং দূর থেকে কোনো তৃতীয় পক্ষের উস্কানিমূলক বা পরিকল্পিত রাবার বুলেটের আঘাতের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ড. ইউনূসের মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে এই ঘটনাকে যেভাবে নিখুঁত নকশায় রূপ দেওয়া হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য আবু সাঈদের বিচার পাওয়া ছিল না; বরং উদ্দেশ্য ছিল লাশের ওপর ভর করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা।
একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকারকে হঠাতে হলে যে ধরনের তীব্র আবেগী মোড়ক প্রয়োজন ছিল, আবু সাঈদের ঘটনাকে ঠিক সেই মোড়কেই বন্দি করা হয়েছিল। আর এই আবেগের আড়ালে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কোমলমতি শিশুদের। ষড়যন্ত্রকারীরা সুপরিকল্পিতভাবে শিশুদের রাজপথে নামিয়ে দেয়, যাতে যেকোনো সংঘাতে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়ে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা যায়।
এই হীন রাজনৈতিক কৌশলে বহু সাধারণ মানুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটে, যার দায় সম্পূর্ণভাবে আন্দোলনের পেছনের পরিকল্পনাকারীদের।একদিকে আবু সাঈদের মৃত্যুকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে উস্কে দেওয়া হচ্ছিল, অন্যদিকে মাঠে নামানো হয়েছিল অত্যাধুনিক ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের অস্ত্রের ব্যবহারকারী পেশাদার ক্যাডারদের।
উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উস্কে দেওয়া এবং পাল্টা হামলায় লাশের মিছিল দীর্ঘ করা। এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে নির্মম শিকার হয়েছে দেশের পুলিশ বাহিনী। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমাল রক্ষা করতে গিয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় শত শত পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে, কুপিয়ে ও ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীকে এভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যই ছিল রাষ্ট্রকে অভিভাবকহীন করা।
আবু সাঈদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেই অন্ধ আবেগের ওপর ভর করে আজ দেশ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে কোনোভাবেই প্রগতি বা উন্নয়ন বলা যায় না। তথাকথিত বিপ্লবের নামে গত দুই বছরে দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা হারাতে বসেছে। যে মেট্রোরেল, পদ্মাসেতু কিংবা মেগা প্রজেক্টগুলো ছিল বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক, সেগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, আবু সাঈদের ঘটনাটি ছিল একটি মহানাটকের সবচেয়ে সংবেদনশীল দৃশ্য, যা ব্যবহার করে আড়াল করা হয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রকে। একটি মিথ্যাকে হাজারবার উচ্চারণ করে সত্য বানানোর যে প্রোপাগান্ডা-কৌশল, জুলাই আন্দোলনে ঠিক সেটিই প্রয়োগ করা হয়েছিল। উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা ও স্থিতিশীলতার যে মজবুত ভিত্তি আওয়ামী লীগ সরকার গত দেড় দশকে তৈরি করেছিল, তাকে ধূলিসাৎ করাই ছিল এই বিদেশি মদদপুষ্ট নীল-নকশার মূল লক্ষ্য। আবু সাঈদের ঘটনাটি ছিল সেই মহাপ্রলয়ের একটি উপলক্ষ মাত্র। তবে ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর; সাময়িক আবেগের বুদবুদ যখন কেটে যায়, তখন নির্মম সত্যের নগ্ন রূপ ঠিকই উন্মোচিত হয়। আজ অধিকার হারানোর হাহাকার আর দেশ ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্তব্ধ হয়ে ভাবছে—একটি কৃত্রিম ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কীভাবে একটি উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রকে সুবর্ণ অতীত থেকে টেনে অন্ধকারের অতল গহ্বরে ঠেলে দিল। কিন্তু ইতিহাস এও বলে, ষড়যন্ত্রের ছাইপাশ থেকে সত্যের ফিনিক্স পাখি ঠিকই একদিন ডানা মেলবে, আর সেদিন কোটি মানুষের বিবেকের কাঠগড়ায় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আজকের এই ছদ্মবেশী নায়কদের। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। আর এভাবেই সময়ের আবর্তে উন্মোচিত হচ্ছে সেই মহানির্মাণের নেপথ্য রূপ, যা ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকবে।