হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুন ১২, ২০২৬

কিচেন ক্যাবিনেট: অন্তর্বর্তী সরকারের অদৃশ্য ক্ষমতার কেন্দ্র

By ড. সুলতান মাহমুদ রানা, অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

9dcc11b1-b39f-4f7b-80ea-634e89f31fef

রাজনীতিতে অনেক শব্দ আছে যেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও লেখা থাকে না। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর প্রভাব রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। “কিচেন ক্যাবিনেট” তেমনই একটি শব্দ। সম্প্রতি বাংলাদেশের ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর দাবি, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সাত সদস্যের একটি কিচেন ক্যাবিনেট ছিল, যেখানে প্রতি সপ্তাহে বৈঠক হতো এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এমনকি ওই ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত অন্যান্য উপদেষ্টা জানতেন না।

অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, সেটি ইতিহাস, দলিলপত্র এবং ভবিষ্যতের গবেষণাই নির্ধারণ করবে। কিন্তু এই বিতর্ক বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হাজির করেছে। রাষ্ট্র কি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, নাকি দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে আরেকটি অদৃশ্য সরকার কাজ করছিল?বাংলাদেশের মানুষ “কিচেন ক্যাবিনেট” শব্দটি নতুন শুনলেও এর বাস্তবতা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা “বিশেষ মহল”, “ঘনিষ্ঠ বৃত্ত”, “অদৃশ্য শক্তি”, “ক্ষমতার কেন্দ্র” কিংবা “ইনার সার্কেল”, “সিন্ডিকেট’ প্রভৃতি শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। প্রায় সব সরকারের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে যে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে কিছু ব্যক্তি নীতিনির্ধারণে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে কিচেন ক্যাবিনেট হলো এমন একটি অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী, যারা সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকেও রাষ্ট্রপ্রধানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে। তারা অনেক সময় মন্ত্রী, সচিব কিংবা আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টাদের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারপ্রধান সরাসরি তাদের মতামত শোনেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং কখনো কখনো আনুষ্ঠানিক সভার আগেই মূল সিদ্ধান্ত সেখানে নির্ধারিত হয়ে যায়।

প্রশ্ন হলো, কেন এমন গোষ্ঠী তৈরি হয়? এর উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ, আমলাতান্ত্রিক এবং প্রায়ই ধীরগতির। সরকারপ্রধান অনেক সময় মনে করেন, বড় পরিসরের সভার পরিবর্তে কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতেও অনেকে ছোট গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রশাসন পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরির মতো বিশাল চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে ছিল। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা থেকে একটি ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী গড়ে উঠতে পারে- এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

কিন্তু সমস্যাও সেখানেই। রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস বলছে, কিচেন ক্যাবিনেট যত শক্তিশালী হয়, আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান তত দুর্বল হতে শুরু করে। ধরা যাক, একটি উপদেষ্টা পরিষদে ২০ জন সদস্য রয়েছেন। কিন্তু প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মাত্র ৫ বা ৭ জন। তাহলে বাকি সদস্যদের ভূমিকা কী? তারা কি কেবল সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য বসে থাকবেন? যদি তা-ই হয়, তাহলে যৌথ দায়িত্বশীলতা, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ধারণা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিনির্ভরতা বরাবরই একটি বড় সমস্যা। আমরা প্রায়ই প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তি খুঁজি। দল নয়, নেতাকে দেখি। নীতি নয়, ঘনিষ্ঠতার মূল্যায়ন করি। ফলে যে কোনো সরকারের মধ্যেই অল্প কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কিচেন ক্যাবিনেট সেই প্রবণতাকেই আরও শক্তিশালী করে।

এ ধরনের ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো জবাবদিহির সংকট। কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হলে দায় কার? মন্ত্রিসভা বলবে তারা সিদ্ধান্ত নেয়নি। সচিবরা বলবেন তারা নির্দেশ পালন করেছেন। অথচ যারা প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের অনেকের নাম হয়তো সরকারি নথিতেই নেই। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ও জবাবদিহির মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রের অনানুষ্ঠানিক নির্দেশ বেশি কার্যকর হয়েছে। ফলে যোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও নিয়মের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতে প্রশাসনের মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিচেন ক্যাবিনেটের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভিন্নমত হারিয়ে যাওয়া। একটি ছোট গোষ্ঠী দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করলে তারা প্রায় একই ধরনের চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে ভিন্ন মত, সতর্কবার্তা বা বিকল্প বিশ্লেষণ ধীরে ধীরে বাদ পড়ে। সরকারপ্রধান তখন এমন একটি পরিবেশে অবস্থান করেন, যেখানে সবাই প্রায় একই কথা বলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এমনিতেই একটি জবাবদিহিহীন সরকার ছিল। কারণ একটি নিয়মিত সরকারকে হটিয়ে এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। ফলে জবাবদিহিহীন পরিস্থতি আরও বশি তৈরি হওয়ার সুযোগ হয়েছে সেই কিচেন ক্যাবিনেটের ফলে। যেখানে অন্যান্য উপদেষ্টারাই অন্ধকারে ছিল দেশের পলিসি সম্পর্ সেখানে সাধারণ জনগণকে ধোকা দেওয়া সহজ ছিল এই ব্যবস্থার মাধ্যমে।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Andrew Jackson-এর সময় "Kitchen Cabinet" শব্দটির জন্ম। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সমর্থকদের একটি দল আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করত। বিরোধীরা অভিযোগ করতেন, নির্বাচিত নয় এমন ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

যুক্তরাজ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী Tony Blair-এর সময় “Sofa Government” শব্দটি জনপ্রিয় হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভার পরিবর্তে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।

ভারতে Indira Gandhi-এর জরুরি অবস্থার সময়ও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আনুষ্ঠানিক সরকারের বাইরে একটি প্রভাবশালী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানের ইতিহাসেও বহুবার দেখা গেছে, মন্ত্রিসভার চেয়ে সেনা কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা বা ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একটি বৃত্ত অধিক প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ফলে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান বিতর্কও মূলত সেই পুরোনো প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছেG রাষ্ট্র কি প্রতিষ্ঠান দিয়ে চলবে, নাকি ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্ক দিয়ে? কেউ কেউ বলবেন, সংকটকালে ছোট একটি দল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সাময়িক প্রয়োজন যদি স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন তা গণতন্ত্র, সুশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমরা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। ফলে সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু ক্ষমতা পরিচালনার ধরন খুব বেশি বদলায় না। এক সরকারের “বিশেষ মহল” অন্য সরকারের “কিচেন ক্যাবিনেট”-এ রূপ নেয়। ব্যক্তি বদলায়, কাঠামো বদলায় না।

ড. ইউনূস সরকারের কিচেন ক্যাবিনেট নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটিকে কেবল ব্যক্তি বা সরকারকেন্দ্রিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত।

কারণ প্রশ্নটি কেবল ড. ইউনূসকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্র কি নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, নাকি কিছু অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্রের মাধ্যমে?

একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা অবশ্যই থাকতে পারে দক্ষ,

জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত মানুষের হাতে।

কিন্তু সেই ক্ষমতা যদি সাংবিধানিক কাঠামো,

প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং জনজবাবদিহির বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটি আর পরামর্শ নয়; সেটি হয়ে ওঠে অদৃশ্য শাসন।

আর সেই সরকারের আরেকজন সদস্য নিজেই যখন অভিযোগ উত্থাপন করেন,

তখন বিষয়টি কতটা ভয়াবহ ছিল তা কিছুটা অনুমান করা যায়। আর ইতিহাস বলে, অদৃশ্য শাসন যতই দক্ষতার দাবি করুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় জনগণকেই।