হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ২৩, ২০২৬

জুলিও কুরি পদক: রক্তস্নাত বাংলায় বঙ্গবন্ধুর মানবতার রাজনীতির প্রতি বিশ্ববিবেকের নতজানু স্বীকৃতি। 

By কৃষিবিদ দীপু, পেশাজীবি ও কলামিস্ট।

5e62e458-9865-4959-bf47-999c0c228840

১৯৭৩ সালের ২৩ মে।ঢাকা শহরে তখন গ্রীষ্মের বিকেল নেমেছে।স্বাধীন দেশের পতাকা বাতাসে উড়ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতর তখনও যুদ্ধ শেষ হয়নি। রায়েরবাজারের বধ্যভূমির মাটি তখনও রক্তের গন্ধ ছড়ায়। কত মা রাতে ঘুম ভেঙে দরজার দিকে তাকান—হয়তো ছেলে ফিরে আসবে। কত নারী আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পান, কারণ যুদ্ধ তাঁদের শরীরের সঙ্গে সঙ্গে আত্মাকেও ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে।বাংলাদেশ তখন বিজয়ী, স্বাধীন, কিন্তু বিধ্বস্ত। 

এই সময়ই পৃথিবী বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে এক সত্য উপলব্ধি করল—

এই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এমন এক নেতা, যিনি প্রতিশোধ শেখাননি; শিখিয়েছেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা।

সেই কারণেই বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “জুলিও কুরি শান্তি পদক”-এ ভূষিত করেছিল।

সেদিনের অনুষ্ঠানটি ছিল শুধু একটি পদক প্রদানের অনুষ্ঠান নয়।সেটি ছিল পৃথিবীর বিবেকের নত হওয়া।

কারণ পৃথিবী দেখেছিল—একজন মানুষ, যিনি রক্তের নদী পেরিয়ে এসেও ঘৃণার ভাষা বলেন না।

যিনি যুদ্ধ জিতে এসেও শান্তির কথা বলেন।যিনি ক্ষমতায় বসেও মানুষের কান্না ভুলে যান না।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির শুরুই হয়েছিল মানুষের দুঃখ দেখে।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে তিনি দেখেছেন, কুকুরের সঙ্গে মানুষ খাদ্যের জন্য লড়ছে।তিনি দেখেছেন, এই বাংলার মানুষ কেবল দরিদ্র নয়—অবহেলিতও।

পরে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি বুঝলেন, বাঙালিকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও দাস বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে।

সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর রাজনৈতিক দর্শন—মানুষের অধিকার ছাড়া শান্তি আসে না।

এই কারণেই ভাষা আন্দোলন থেকে ছয় দফা—সব আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা।১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যখন বলেছিলেন—“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,”তখন সেটি কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল না।

এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আর্তনাদ।

তিনি আরও বলেছিলেন—

“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।”

এই কথাগুলো আজও শুনলে মনে হয়, একজন নেতা নয়—একজন পিতা তাঁর সন্তানের মুক্তির শপথ নিচ্ছেন।

জুলিও কুরি শান্তি পদক বঙ্গবন্ধুকে কেন দেওয়া হয়েছিল—এর উত্তর লুকিয়ে আছে এখানেই।

কারণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো আগ্রাসনের যুদ্ধ ছিল না।এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ।ভাষা রক্ষার যুদ্ধ।মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার যুদ্ধ।

বিশ্ব শান্তি পরিষদ বুঝেছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই যুদ্ধ মানবতার পক্ষে ছিল।

পৃথিবীর বহু নেতা যুদ্ধ করেছেন ক্ষমতার জন্য।কিন্তু বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ করেছেন মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য,

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি করা। তিনি চাইলে ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণে তিনি বলেছিলেন—“বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। এর ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ।”

এই চারটি মূলনীতির ভেতরেই ছিল তাঁর শান্তি দর্শন।তিনি জানতেন, ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে শান্তি আসে না,

ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে পতাকা তুলে দিলেই স্বাধীনতা পূর্ণ হয় না।

তাই যুদ্ধশেষে তিনি প্রথমেই পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন।

যুদ্ধাহত মানুষ, বিধবা নারী, এতিম শিশু—সবাইকে নিয়ে তিনি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন।

যুদ্ধের নির্যাতিত নারীদের তিনি “বীরাঙ্গনা” উপাধি দিয়েছিলেন।

কারণ তিনি জানতেন, একটি জাতি যদি তার ক্ষতবিক্ষত নারীদের সম্মান না দেয়, তবে সেই জাতির স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ।

বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের সবচেয়ে বড় জায়গা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য।

একবার তিনি বলেছিলেন—“আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও আমি তাদের খুব বেশি ভালোবাসি।”

এই একটি বাক্যের মধ্যে যেন শেখ মুজিবের সমস্ত মানবিকতা ধরা আছে।

তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপতি, কিন্তু তাঁর কষ্ট ছিল কৃষকের জন্য।তিনি ছিলেন বিশ্বনেতা, কিন্তু তাঁর চোখ ভিজে উঠত অনাহারী শিশুর কথা শুনে।

এই মানবিকতার কারণেই বিশ্বনেতারাও তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখতেন।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, সাহস, নেতৃত্ব ও মানবিক উচ্চতায় মুগ্ধ হয়ে ১৯৭৩ সালে 

আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) সম্মেলনে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন—“আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি,

এই উক্তি কেবল একজন নেতার প্রশংসা নয়।এটি ছিল একজন মানুষের উচ্চতার স্বীকৃতি।

জুলিও কুরি শান্তি পদক তাই শুধু বঙ্গবন্ধুর হাতে ওঠেনি।সেদিন পদকটি উঠেছিল বাংলার মাটির হাতে।

সেই মাটির, যেখানে মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছে।

আজ এত বছর পরও যখন সেই ইতিহাস মনে পড়ে, বুকের ভেতর এক ধরনের নীরব কষ্ট জন্ম নেয়।

কারণ, যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের শান্তি ও মর্যাদার জন্য লড়লেন, তাঁর জীবনই শেষ হলো ঘাতকের বুলেটে। তবু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—ভালোবাসাকে হত্যা করা যায় না।তাই আজও বাংলার কোনো দরিদ্র মানুষ ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখলে সেখানে বঙ্গবন্ধু আছেন।আজও কেউ মাথা উঁচু করে স্বাধীনতার কথা বললে সেখানে বঙ্গবন্ধু আছেন।আজও এই দেশের পতাকা বাতাসে উড়লে মনে হয়, একজন মানুষ এখনও তাঁর দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলার আকাশজুড়ে,

জুলিও কুরি শান্তি পদক সেই মানুষের প্রতি পৃথিবীর শ্রদ্ধা।যিনি যুদ্ধের আগুনের মধ্যেও শান্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন।যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য ব্যবহার করেছিলেন।তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার নাম।