হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ৩০, ২০২৬

হরমুজে যুদ্ধের ছায়া, ১৩ ভারতীয় জাহাজ সরাতে জরুরি অভিযান: জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্য রক্ষায় তৎপর নয়াদিল্লি।

By আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বেঙ্গল টাইমস

IMG_6465

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঝুঁকির মুখে; ভারতীয় নাবিক ও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চ-অগ্রাধিকার অভিযান শুরু করেছে ভারত সরকার।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ১৩টি ভারতীয় পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য জরুরি ও উচ্চ-অগ্রাধিকার অভিযান শুরু করেছে ভারত সরকার। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় নয়াদিল্লি বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। 

ভারতের বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য হলো হরমুজ অঞ্চলে অবস্থানরত ভারতীয় জাহাজ এবং শত শত নাবিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সকল ভারতীয় নাবিক নিরাপদ আছেন এবং এখন পর্যন্ত কোনো শত্রুতামূলক ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। 

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলোর একটি। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। 

গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বহু জাহাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল এবং অনেক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তাজনিত কারণে এই রুট এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হয়েছে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে ১১টি ভারতীয় জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হলেও আরও ১৩টি জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছিল। বর্তমান অভিযানের মাধ্যমে এসব জাহাজকে নিরাপদ করিডর ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে।  

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে ইরান সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং দেশটিতে অবস্থানরত ভারতীয়দের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় মিশনগুলোকে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সহায়তা কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন যে, ভারতের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। দেশটির অপরিশোধিত তেলের উল্লেখযোগ্য অংশ এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG)-এর বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছে। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী সংকট ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।  

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব সাধারণ ভোক্তার জীবনেও পড়বে।  অন্যদিকে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্যও বড় হুমকি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত জাহাজ হরমুজের পরিস্থিতির কারণে বিলম্ব, অতিরিক্ত বীমা ব্যয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে। কিছু জাহাজকে নিরাপদে চলাচলের জন্য বিশেষ সামরিক সহায়তা ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু তেলবাহী জাহাজ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা সীমিত করে বা বিশেষ নিরাপত্তা কৌশল ব্যবহার করে হরমুজ অতিক্রম করার চেষ্টা করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।  ভারতের জন্য এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হাজার হাজার ভারতীয় নাবিক ও প্রবাসী নাগরিকের নিরাপত্তা। ভারত সরকার জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার ভারতীয়কে ইরানসহ সংঘাতপ্রবণ এলাকা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।  বিশ্লেষকদের মতে, ১৩টি জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার অভিযান কেবল একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা পদক্ষেপ নয়; এটি ভারতের বৃহত্তর জ্বালানি কৌশল এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ। বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারতের জন্য জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই নয়াদিল্লি কূটনৈতিক যোগাযোগ, নৌ-নিরাপত্তা এবং জরুরি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করছে।  পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যদি উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম, শিপিং খরচ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে। আর যদি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজার কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেতে পারে।তবে আপাতত ভারতের প্রধান লক্ষ্য একটাই—হরমুজের ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা থেকে ১৩টি ভারতীয় জাহাজ এবং তাদের নাবিকদের নিরাপদে বের করে আনা। সেই লক্ষ্যেই দিনরাত কাজ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো, আর গোটা অঞ্চল নজর রাখছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরটির দিকে।