বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে এইচআরডাব্লিউর উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার আহ্বান
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির দাবি, গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হলেও অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে না, যা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত এক ডজনেরও বেশি মামলার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে তারা বিচারপ্রক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, একাধিক মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখা গেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের ভাষা বিভিন্ন আসামির বিরুদ্ধে হুবহু ব্যবহার করা হয়েছে বলে তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে সেই বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে বিচারব্যবস্থা ব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যেসব উদ্বেগ
এইচআরডব্লিউর মতে, বর্তমান আইনের আওতায় রাষ্ট্রপক্ষের হাতে এমন কিছু ক্ষমতা রয়েছে, যা অভিযুক্তদের ন্যায়বিচারের অধিকারকে সীমিত করতে পারে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে—
- পর্যাপ্ত প্রাথমিক প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের সুযোগ।
- দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ না জানানোর অভিযোগ।
- আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সীমিত সময়।
- অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার অভাব।
- সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা পক্ষের সুযোগ সীমিত হওয়া।
সাংবাদিকদের মামলার প্রসঙ্গ
বিবৃতিতে ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় ২০২৬ সালে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা মামলারও উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, অভিযুক্ত সাংবাদিকদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারের কারণ লিখিতভাবে জানানো হয়নি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন
এইচআরডব্লিউ আরও দাবি করেছে, কয়েকটি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাদের রেকর্ড করা সাক্ষ্যবিবরণীতে অভিন্ন ভাষা ও অনুলিপির মতো অংশ পাওয়া গেছে, যা সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
সংস্থাটি একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেছে, একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দিতে একই ভাষার দীর্ঘ অংশ হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এছাড়া একটি আলোচিত মামলায় একজন সরকারি কৌঁসুলির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগে প্রকাশিত অডিওর বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অভিযোগ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কৌঁসুলি পদত্যাগ করেন, তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি বলে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের পটভূমি
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার পরিচালনার উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনে সংশোধন এনে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার সম্প্রসারণ করা হয়। তবে এইচআরডব্লিউর মতে, সংশোধন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
এইচআরডব্লিউর আহ্বান
বিবৃতির শেষাংশে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থা ব্যবহারের যে অভিযোগ ছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, দুর্বল বা অভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মামলা পরিচালিত হলে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এতে ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার ও দেশের জনগণের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
উল্লেখ্য, এইচআরডব্লিউর এসব পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য তাদের নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।