চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের অভিযোগ: মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করার আহ্বান এইচআরডব্লিউর
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক, প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো একটি কথিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির দাবি, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জেলে মিরাজ শেখ গত ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ডের পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
ঘটনার তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ অবিলম্বে মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধে নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় যা জানা গেছে
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মণি গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় জেলে ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখকে সর্বশেষ কোস্টগার্ড সদস্যদের হেফাজতে দেখা গেছে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, গত ১০ এপ্রিল রাতে তাঁকে আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।পরদিন তাঁর পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাঁদের জানানো হয়, মিরাজকে নিয়ে একটি অভিযান চলছে এবং পরে আসতে বলা হয়। কিন্তু বিকেলে আবার গেলে কোস্টগার্ড জানায়, মিরাজ কখনোই তাদের হেফাজতে ছিলেন না।
মোটরসাইকেল নিয়েও রহস্য
অভিযোগ অনুযায়ী, একটি চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল। দোকানটির মালিক এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, ২১ এপ্রিল এক ব্যক্তি নিজেকে কোস্টগার্ড সদস্য পরিচয় দিয়ে মিরাজের মোটরসাইকেল নিয়ে যান।
তবে পরদিন আবার কোস্টগার্ড সদস্যরাই সেটি ফিরিয়ে দেন।মিরাজের পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটনার সময়, স্থান এবং কীভাবে মিরাজকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ
পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত মিরাজ শেখের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এরপর গত ১২ জুলাই মিরাজের বাবা হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে নিখোঁজ জেলেকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
কোস্টগার্ডের বক্তব্য
কোস্টগার্ডের পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মিরাজ শেখকে আটকের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তবে এইচআরডব্লিউ বলছে, ঘটনাটি বাংলাদেশের অতীতের জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে উদ্বেগজনক মিল বহন করে।
স্বাধীন তদন্ত ও সংস্কারের দাবি
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা জোরপূর্বক গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের উচিত কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে উদ্বেগ
এইচআরডব্লিউ আরও জানিয়েছে, জোরপূর্বক গুমের তদন্ত পুলিশের অধীন রাখার প্রস্তাব নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। সংস্থাটির মতে, এতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।
তাদের সুপারিশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ক্ষমতা দিতে হবে।
একই সঙ্গে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।