মানবিকতার হাতকড়া ও আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ।
By শঙ্খচিল
গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় বাতি জ্বলছে। সেখানে জড়ো হয়েছেন কিছু ছিন্নমূল, দিনমজুর আর অসহায় মানুষ।
তারা কোনো ত্রাণের অপেক্ষায় নন, অপেক্ষা করছেন একজন চিকিৎসকের জন্য। রাত ১২টা বাজতেই সাইকেল বা মোটরসাইকেলে চেপে সেখানে হাজির হতেন এক ভদ্রলোক। পরম মমতায় রোগীদের দেখতেন, ব্যবস্থাপত্র লিখতেন, আর পকেট থেকে টাকা বের করে ওষুধের ব্যবস্থাও করে দিতেন।
কয়েক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘মধ্যরাতের ডাক্তার’ শিরোনামে এই মানুষটিকে নিয়েই ফিচার ছাপা হয়েছিল। তিনি ডা. সামির হোসেন মিশু।
বগুড়ার সাধারণ মানুষের কাছে যিনি একজন মানবিক চিকিৎসক এবং চেনা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। কিন্তু আজ এক নির্মম ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দোলাচলে সেই মানবিক হাত দুটোতেই উঠেছে হাতকড়া। জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি এখন কারাবন্দী।
ডা. মিশুর এই গ্রেপ্তার শুধু একজন ব্যক্তির কারাবাস নয়; এটি আমাদের সমাজ, রাজনীতি এবং আইনের শাসনের এক চরম সংকটের প্রতিচ্ছবি।
রাজনীতির সমীকরণ ও মানবিকতার বলি। ডা. মিশু স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।
রাজনীতি করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর বিরুদ্ধে কি কোনো সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির অভিযোগ ছিল?
স্থানীয়দের এবং তাঁর সহকর্মীদের ভাষ্যমতে—না। পেশাগত জীবনে তিনি দল-মত নির্বিশেষে মানুষকে সেবা দিয়েছেন।
অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের মতো একটি
ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল আন্দোলনের ঢাল ব্যবহার করে তাঁকে আসামি করা হলো। কেবল রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শের কারণে একজন আজীবন সেবাব্রতী মানুষকে এভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কি প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়?
ঘুষের রাজত্ব বনাম নৈতিকতার দেয়াল। ডা. মিশুর এই পুরো ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত অধ্যায়টি হলো মামলার 'রফা-দফা'র চেষ্টা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের বিনিময়ে তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের ‘খরচাপাতি’ বা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। আমাদের দেশের প্রচলিত 'মামলা-বাণিজ্য' সংস্কৃতির এটি একটি নগ্ন রূপ।
ডা. মিশু চাইলে হয়তো সেই টাকা দিয়ে আজ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারতেন।
কিন্তু তিনি আপস করেননি। নিজে নির্দোষ হওয়ায় এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার নৈতিকতায় অটল থাকায় তিনি কারাগারে যাওয়াকেই বেছে নিয়েছেন।
এই দৃঢ়তা প্রমাণ করে, তিনি শুধু পোশাকেই চিকিৎসক নন, মনে-প্রাণেও একজন আদর্শিক মানুষ। তাঁর এই আপসহীনতা আমাদের সমাজকে এক বড় বার্তা দেয়—অন্যায় মেনে নেওয়ার চেয়ে প্রতিবাদী হওয়া শ্রেয়।
বিবেকের আদালতের কাছে প্রশ্নএকজন জনপ্রিয় ও মানবিক চিকিৎসককে এভাবে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো পুরো চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি নেতিবাচক এবং ভীতিকর বার্তা দিচ্ছে।
চিকিৎসকেরা যদি স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে সেবা দিতে না পারেন, তবে সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের দাবি হলো—কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, বরং তথ্যের সত্যতা যাচাই করে মামলা পরিচালনা করা উচিত। ডা. সামির হোসেন মিশুর মতো একজন সজ্জন মানুষকে এভাবে কারাগারে আটকে রাখা বগুড়ার সর্বস্তরের মানুষ মেনে নিতে পারছে না।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই মিথ্যা মামলার বেড়াজাল থেকে ডা. মিশুকে মুক্তি দেবেন। মানবিকতা এভাবে রাজনীতির মারপ্যাঁচে হেরে যেতে পারে না। আমাদের ‘মধ্যরাতের ডাক্তার’কে তাঁর রোগীদের মাঝে, তাঁর প্রিয় শহরের বুকে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।