জার্মানিতে বাড়ছে ইহুদিবিদ্বেষ, হলোকাস্ট স্মৃতি কি হারাচ্ছে প্রভাব? উদ্বেগে ইউরোপ
By আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বেঙ্গল টাইমস
ইউরোপজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ (অ্যান্টিসেমিটিজম) বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে জার্মানি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে হলোকাস্টের স্মৃতি এবং নাৎসি অপরাধের দায় স্বীকারের সংস্কৃতি দেশটির জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষীরা প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছেন, আর একই সঙ্গে সমাজের একটি অংশ অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
গত বছর ১০৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফেরা জার্মানির অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্ব মার্গট ফ্রিডল্যান্ডার। তিনি নাৎসি গণহত্যার জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে কয়েক দশক ধরে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস জানাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কিন্তু তার মৃত্যু সেই প্রজন্মের অবসানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।ইহুদি ক্লেইমস কনফারেন্সের (Jewish Claims Conference) এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে জীবিত হলোকাস্ট বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা কমে প্রায় ২১ হাজার ৩০০ জনে নেমে আসবে, যা বর্তমান সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কম।
অতীত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে
জার্মানির বিলেফেল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৮.১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, “ন্যাশনাল সোশ্যালিজম বা নাৎসি যুগের অধ্যায় এখন বন্ধ করে দেওয়ার সময় এসেছে।” ২০১৮ সাল থেকে এই প্রশ্নে জরিপ চালু হওয়ার পর এবারই প্রথম অতীত থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে মত দেওয়া মানুষের সংখ্যা বিপরীত মতের চেয়ে বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নয়; বরং জার্মান সমাজে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
তরুণদের মধ্যে ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা
হলোকাস্ট জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তরুণদের মধ্যে এ বিষয়ে উদ্বেগজনক অজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ক্লেইমস কনফারেন্সের এক জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী জার্মানদের ১২ শতাংশ কখনও হলোকাস্টের নামই শোনেননি।
যেখানে সব বয়স মিলিয়ে এই হার ৫ শতাংশ।একই জরিপে দেখা যায়, তরুণদের ১৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে হলোকাস্টে নিহত ইহুদিদের সংখ্যা “অতিরঞ্জিত” করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে এই মতের সঙ্গে একমত মানুষের হার ১০ শতাংশ।গবেষকরা বলছেন, ইতিহাস সম্পর্কে এই অজ্ঞতা ভবিষ্যতে চরমপন্থা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিস্তারের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
উগ্র ডান ও বাম রাজনীতির উত্থান
জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD) সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
দলটির বিভিন্ন নেতা অতীতে হলোকাস্ট স্মৃতিচর্চার বর্তমান ধারা থেকে সরে আসার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।অন্যদিকে, বামপন্থী কিছু গোষ্ঠী দাবি করছে, জার্মানির পররাষ্ট্রনীতি—বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন—হলোকাস্ট-পরবর্তী অপরাধবোধের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া উচিত।
বার্লিনের বিভিন্ন দেয়ালে লেখা “জার্মান অপরাধবোধ থেকে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো” (Free Palestine from German guilt) স্লোগান সেই বিতর্ককেই সামনে নিয়ে এসেছে।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন জার্মানির সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরছে।
হলোকাস্টের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কি সেই স্মৃতির প্রত্যক্ষ সাক্ষীরা না থাকলেও একইভাবে টিকে থাকবে?
ইউরোপে যখন ইহুদিবিদ্বেষ আবারও বাড়ছে, তখন যদি জার্মানি অতীতের স্মৃতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে শুরু করে, তবে তার প্রভাব পুরো ইউরোপীয় রাজনীতিতেই পড়তে পারে।
একই সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকির মুখে জার্মানি সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পুনরায় সামরিক শক্তি বৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এমন সময় দেশটি যদি তার দীর্ঘদিনের নৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হলোকাস্ট স্মৃতিচর্চা থেকে সরে আসে, তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর আস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরই নির্ধারণ করবে—জার্মানি কি ইতিহাসের শিক্ষা ধারণ করে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে তার অবস্থান অটুট রাখবে, নাকি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অতীতের স্মৃতি ধীরে ধীরে জাতীয় চেতনার প্রান্তে সরে যাবে।