কারখানা রেডি, গ্যাস নেই: হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে ঋণের সুদের বোঝা
By বেঙ্গল টাইমস বিজনেস ডেস্ক, ঢাকা, ২৪ জুন ২০২৬
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাস-সংযোগের শতভাগ আশ্বাস পেয়ে বিপুল উৎসাহে শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তবে কারখানা নির্মাণের কাজ শেষ হলেও মেলেনি প্রতিশ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংযোগ। ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে থাকার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ঋণের চড়া সুদ গুনতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
বর্তমানে পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্প সংযোগের ১,৮০০টির বেশি আবেদন জমা রয়েছে, যার মধ্যে সব প্রক্রিয়া শেষ করে টাকা জমা দিয়েও গ্যাসের অপেক্ষায় বসে আছে ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান।
মেগা বিনিয়োগ ও ঋণের ফাঁদে মেঘনা গ্রুপ (এমজিআই)
কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭,৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বিশাল কারখানা নির্মাণ করেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। এর মধ্যে ২,৪৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কাচ তৈরির কারখানাটি আড়াই বছর এবং ৪,৮৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের রডের কারখানাটি দেড় বছর ধরে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আছে।
সুদের বোঝা: আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা (IFC) থেকে নেওয়া এই ঋণের বিপরীতে এমজিআই-কে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা সুদ গুনতে হচ্ছে।
- উদ্যোক্তার বক্তব্য: এমজিআই-এর চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গত ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক সভায় জানান, "এই বিনিয়োগ বিদেশি ঋণে হয়েছে, যা পুনঃ তফসিল (রিশিডিউল) বা সুদ মাফ করার সুযোগ নেই। গ্যাস না পেলে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির এই প্রকল্প চালু করা অসম্ভব।"
- অবকাঠামোগত অবহেলা: নিজেদের খরচে ৫৫০ কোটি টাকা দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করলেও সংযোগ মেলেনি।
পাশাপাশি রাস্তা সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে ১,৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়া হলেও পূর্ববর্তী সরকার বা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার—
কেউই তা অনুমোদন করেনি।
সংকটে সিটি গ্রুপ ও অন্যান্য শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী
শুধু মেঘনা গ্রুপই নয়, মুন্সিগঞ্জের হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছে সিটি গ্রুপ।
সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ ও এলপিজি—এই ৫টি বড় কারখানা ২০২২ সালে চালুর কথা থাকলেও ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব পাইপলাইন নির্মাণের পরও গ্যাস মেলেনি। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান জানান, প্রতিদিন তাদের প্রায় ৫ কোটি টাকা করে সুদ গুনতে হচ্ছে।
এছাড়া গাজীপুরের মাওনায় টাকা জমা দিয়েও ২ বছর ধরে গ্যাস পাননি হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ। জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে সুইফট শিল্ড (১৫ কোটি) ও রিসাস কেমি (৯৪ কোটি) এবং
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে হেলথ কেয়ার লাইফ সায়েন্স (৫০০ কোটি) ও
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ (১,৪০০ কোটি)—সবই গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস সংকটের নেপথ্যে ও বর্তমান পরিস্থিতি
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৭০ কোটি ঘনফুট। প্রতিশ্রুত সংযোগগুলো চালু করতে আরও অন্তত ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের আমদানিনির্ভর নীতি: বিগত সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর চেয়ে এলএনজি আমদানিতে বেশি জোর দিয়েছিল।
২০২২ সাল থেকে ডলার সংকটের কারণে সেই আমদানি ব্যাহত হওয়ায় এবং জ্বালানি খাতে বিপুল দেনা রেখে যাওয়ায় এই ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে।
- সরকারের আশ্বাস: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে এবং একই শিল্পগোষ্ঠীর সব কারখানায় একযোগে না দিয়ে সবাইকে কিছু কিছু করে গ্যাস দেওয়ার
- পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
- সমাধান কী?
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী
সতর্ক করে বলেছেন, গ্যাস দিতে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান হবে না এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
ভবিষ্যতে বিনিয়োগে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম (সিপিডি)
এবং এম শামসুল আলমের (ক্যাব) মতে,
আগামী ৪-৫ বছর এই গ্যাস সংকট থাকবেই।
তাৎক্ষণিক কোনো জাদুকরী সমাধান নেই।
মধ্যমেয়াদি সংকট কাটাতে এখন
থেকেই অভ্যন্তরীণ কূপ
খনন ও সমুদ্রে গ্যাস
অনুসন্ধানে জোর
দিতে হবে এবং
বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।