এইচএসসির ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে একের পর এক ভুল, ক্ষোভে ফুঁসছেন পরীক্ষার্থীরা
By শিক্ষা ডেস্ক | বেঙ্গল টাইমস, প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬
ঢাকা: চলমান উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ইংরেজি ভার্সনের বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্নপত্রে অনুবাদগত ভুল, গাণিতিক অসঙ্গতি এবং বৈজ্ঞানিক পরিভাষার ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে।
এসব ভুলের কারণে ইংরেজি ভার্সনের পরীক্ষার্থীরা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
পরীক্ষার্থীদের দাবি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সন—দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা থাকলেও ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রথমে বাংলা ভাষায় প্রশ্ন তৈরি করে পরে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের যথাযথ পর্যালোচনার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে আক্ষরিক অনুবাদে প্রশ্নের মূল অর্থই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে বেশি ত্রুটি
পরীক্ষার্থীরা জানান, প্রথম চারটি ভাষাভিত্তিক বিষয়ে অনুবাদের প্রয়োজন না থাকলেও পরবর্তী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়গুলোর প্রায় সব পরীক্ষায় গুরুতর ত্রুটি দেখা গেছে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এমন ভুল রয়েছে, যা প্রশ্নের মূল ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে অর্থ বদলে যাওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্রের বহুনির্বাচনী অংশে একটি প্রশ্নে ‘দক্ষতা’ (Efficiency) ও ‘সরবরাহকৃত শক্তি’ (Energy)-এর গুণফল নির্ণয়ের কথা থাকলেও ইংরেজি ভার্সনে ‘Energy’-এর পরিবর্তে ‘Power’ লেখা হয়েছে।
ফলে বাংলা ভার্সনে যেখানে সঠিক উত্তর ‘Work Done’, সেখানে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্ন অনুযায়ী উত্তর দাঁড়ায় ‘Power Obtained’। অথচ দুটি উত্তরই বিকল্প হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া অষ্টম সৃজনশীল প্রশ্নে ‘Overtone’ ও ‘Beat’—দুটি ভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিভাষাকে একইভাবে ‘Note’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, যা প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকেই পরিবর্তন করেছে।
ষষ্ঠ প্রশ্নে ‘এক-তৃতীয়াংশ কমানো হয়েছে’ বাক্যাংশের ভুল অনুবাদের কারণে গাণিতিক মান পরিবর্তিত হয়েছে। সপ্তম প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে একটি ভেক্টরের মান +120ĵ থাকলেও ইংরেজি ভার্সনে তা –120ĵ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে।
- দ্বিতীয়পত্র ও আইসিটিতেও একই চিত্র
- একই ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্র ও আইসিটি পরীক্ষার প্রশ্নেও। পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্রের একটি সৃজনশীল প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে থাকা ‘সাম্যাবস্থা’ (Equilibrium)-এর শর্ত ইংরেজি ভার্সনে বাদ পড়ে যায়।
অন্যদিকে আরেকটি প্রশ্নে বাংলা ভার্সনে উল্লেখিত ‘P’ বিন্দুর তথ্য ইংরেজি প্রশ্নপত্রে অনুপস্থিত ছিল। এতে দুই মাধ্যমে একই পরীক্ষার প্রশ্নে তথ্যগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে।
রসায়নের প্রশ্নেও অস্পষ্টতা
রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের একটি প্রশ্ন নিয়েও আপত্তি তুলেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। প্রশ্নে K₂Cr₂O₇-কে শুধু রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এর ঘনমাত্রা (0.1 M), পরিমাণ (80 mL) এবং acidic medium-এর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
সিনিয়র শিক্ষকদের মতে, প্রশ্নটি আরও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। পাশাপাশি Container-C-এ থাকা iron ore-কে ভুলবশত salt হিসেবে উল্লেখ করাও একটি গুরুতর ভাষাগত ত্রুটি।
শিক্ষা বোর্ডের বক্তব্য
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ভাষাগত ও অনুবাদজনিত ত্রুটির অভিযোগ প্রায় প্রতি বছরই ওঠে।
চলতি বছরের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ শাখাকে অবহিত করেছে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ভবিষ্যতে ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পর্যালোচনায় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হবে, যাতে এ ধরনের ভুল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তিনি আরও বলেন,
প্রশ্নপত্র প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া গোপনীয় হওয়ায় শিক্ষা বোর্ডের পক্ষে আগে থেকেই সব প্রশ্ন যাচাই করা সম্ভব হয় না।
তবে যেসব প্রশ্নে ত্রুটি পাওয়া গেছে, সেগুলোর কারণে কোনো পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
মূল্যায়নের সময় শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
শিক্ষার্থীদের দ্রুত সমাধানের দাবি
এদিকে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও অনুবাদ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একই পরীক্ষায় দুই মাধ্যমে ভিন্ন তথ্য বা ভুল অনুবাদ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ভবিষ্যতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে একাধিক ধাপে প্রশ্নপত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে এ ধরনের ত্রুটি পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান ও ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।