মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের আশঙ্কা: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর সর্বাত্মক সংঘাতের শঙ্কা
By আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বেঙ্গল টাইমস
ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) ভেঙে যাওয়ার পর গত এক সপ্তাহ ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমঝোতার শর্ত বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানও আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি থেকে সরে এসেছে।
তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আরও দুই থেকে তিন দিন হামলা অব্যাহত রাখলে তারা “সর্বাত্মক সামরিক অভিযান” শুরু করবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, আল জাজিরা ও এএফপির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
কেন আবার যুদ্ধ?
গত ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল শর্ত ছিল—
* সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি
- * হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা
- * ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, এবং
- * ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করা।
- কিন্তু ২২ জুন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরপরই নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে আলোচনায় ফিরে আসার আলটিমেটাম দিয়ে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে।
টানা সাত দিনের মার্কিন হামলায় বিধ্বস্ত ইরান
টানা সপ্তম দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার, নৌঘাঁটি, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতু এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।
হতাহত: ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন সংঘাতে অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
মানবিক সংকট: খুজেস্তান প্রদেশের অন্তত ৯৫টি স্থানে হামলার ফলে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলায় ছড়াচ্ছে সংঘাত
মার্কিন হামলার জবাবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইন: কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ফলে কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও রানওয়েও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
জর্ডান: আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এতে সংঘাত শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৬ জনে পৌঁছেছে।
সৌদি আরব ও সিরিয়া: দীর্ঘ তিন মাস পর সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং ইয়ানবু এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কসংকেত জারি করা হয়। একই সঙ্গে সিরিয়ায়ও মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
“মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। ওয়াশিংটন বারবার সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করে প্রমাণ করেছে যে তাদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য নয়।”
— আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় তেহরানও সমঝোতার সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অব্যাহত থাকলে ইরান সর্বাত্মক প্রতিরোধ ও পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করবে।
কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন,
পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক দিকে মোড় নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংঘাত থামাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক এক মহাযুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে।