কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস: প্রাণহানি বেড়ে ২৩, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড় লাখ মানুষ
By নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার | ১১ জুলাই ২০২৬
টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় কক্সবাজার জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে জেলার ১০টি উপজেলায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ৩৭ হাজার ৩৬৫টি পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।জেলা প্রশাসন জানায়, ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় একের পর এক ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। এখন পর্যন্ত ১৯০টি পাহাড়ধসের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া বন্যা ও দুর্যোগ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনায় আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন, যারা জেলার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছিলেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তিন উপজেলা
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে রয়েছে। বহু বাড়িঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনো নৌকা ছাড়া চলাচল সম্ভব নয়। বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত, ট্রেন চলাচল বন্ধ
বন্যার কারণে জেলার অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ হাজার ৭৬০ মিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অনেক স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের ঢল
দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিলেও কিছু মানুষ এখনো নিজ নিজ বাড়িতে আটকে আছেন।
দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীদের অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৪০ দশমিক ৪ মেট্রিক টন চাল, ৭৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হচ্ছে।
আবহাওয়া বিভাগের সতর্কতা
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
ফলে নতুন করে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রশাসনের আহ্বান
জেলা প্রশাসন জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা দ্রুত ত্যাগ করে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় সব সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে
এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে এবং নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং দুর্গত মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।