টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস, রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ নিহত বেড়ে ৯
By কক্সবাজার প্রতিনিধি | বেঙ্গল টাইমস, কক্সবাজার | ৬ জুলাই ২০২৬
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক পাহাড়ধসে এক স্থানীয় বাসিন্দাসহ মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আটজনই উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রোববার দুপুর থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা অতি ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে একাধিক স্থানে ধসের ঘটনা ঘটে।
পৌর এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু
সোমবার ভোর ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে আলী আকবর (৪৫) নামের এক ব্যক্তি ও তাঁর
পরিবারের আরও দুই সদস্য মাটির নিচে চাপা পড়েন।স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাঁদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে
গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অপর দুই সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান,
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন কাজ করছে।
উখিয়ার তিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিহত ৮
এর আগে রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে ৩টার মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) আশ্রয়শিবিরে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসে আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়।
জামতলী আশ্রয়শিবির (ক্যাম্প-১৫)
রাত দেড়টার দিকে ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে কামাল হোসাইনের ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস। এ ঘটনায় পরিবারের আরও দুই সদস্য আহত হয়েছেন।
কুতুপালং আশ্রয়শিবির (ক্যাম্প-৭)
রাত ২টার দিকে ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে রশিদ উল্লাহর সাত বছর বয়সী ছেলে মো. একরামের মৃত্যু হয়।উদ্ধার করেন।
বালুখালী আশ্রয়শিবির (ক্যাম্প-১১)রাত সাড়ে ৩টার দিকে সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার ভাই-বোন নিহত হয়।
নিহতরা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), হারুনুর রশিদ (৩) এবং মোহাম্মদ রিহান (৫)।আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন),
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্য এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে হতাহতদের
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঝুঁকিতে প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা
রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিচালনাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি ও পাহাড় উজাড় করে ৩৪টি আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হয়।
বর্তমানে ৩৩টি শিবিরে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।বনভূমি উজাড় ও পাহাড় কাটার কারণে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এসব এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমানে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পাহাড়ের ঢালু ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছেন, যা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
আরও ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান,
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী অন্তত দুই দিন
ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় আরও
পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড়ের পাদদেশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসবাসকারী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।