ডিবি হেফাজতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মীর মৃত্যু: ওসিসহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬
ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা ও পেশাগত আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ডিবির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ১১ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শেষে এ সুপারিশ করে প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা ও সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণে ঘাটতির বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী গণমাধ্যমকে জানান, তদন্ত শেষ হয়েছে এবং প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন পুলিশ সদর দপ্তর তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। বিভাগীয় মামলা গ্রহণ করা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
যেভাবে আটক হন ইশতিয়াক
গত ২০ জুন বিকেলে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার নিজ বাড়ির সামনে থেকে ডিবি পুলিশ মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তকে আটক করে। পুলিশ জানিয়েছিল, একটি মাদক সংক্রান্ত মামলার তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল।
তবে পরিবারের দাবি, তাকে আটকের সময় কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি এবং পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি। আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
হাসপাতালে মৃত্যু
আটকের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে ইশতিয়াককে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালে আনার সময় তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল।
মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
পরিবারের অভিযোগ
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ডিবি হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনের কারণেই ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, মরদেহে আঘাতের একাধিক চিহ্ন ছিল এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেন।
তারা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পুলিশের বক্তব্য
অন্যদিকে পুলিশ দাবি করে, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ইশতিয়াক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে বাঁচাতে পারেননি।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, পুরো ঘটনার তদন্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে—
- * আটক ও হেফাজতের পুরো প্রক্রিয়া আইন অনুযায়ী অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
- * থানার জিডি, ডিবি রেজিস্টার এবং অন্যান্য নথিতে তথ্যের মিল রয়েছে কি না।
- * হেফাজতে থাকাকালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা ছিল কি না।
- * দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মানবাধিকার ও পুলিশ প্রবিধান অনুসরণ করেছেন কি না।
- * ঘটনার সময়কার ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য এবং নথিপত্রের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
ঘটনাটি নিয়ে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন। রুলে নিহতের পরিবারকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বিভাগীয় মামলা কী?
বিভাগীয় মামলা কোনো ফৌজদারি মামলা নয়। এটি সরকারি কর্মচারীর চাকরিগত আচরণ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্কবার্তা, পদাবনতি, সাময়িক বরখাস্ত, চাকরিচ্যুতি কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হতে পারে। তবে ফৌজদারি দায়ের প্রশ্নটি আলাদাভাবে আইন অনুযায়ী বিবেচিত হয়।
নজর এখন সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তে
তদন্ত কমিটির সুপারিশের পর এখন পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বিভাগীয় মামলা অনুমোদিত হলে অভিযুক্ত ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম শুরু হবে। একই সঙ্গে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় চলমান বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।