সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা বেড়েছে, উদ্বেগ প্রকাশ টিআইবির
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমসঢাকা, ২৫ জুন ২০২৬
দেশের বিভিন্ন সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রকাশিত ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সাধারণ নাগরিকদের দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল তুলে ধরে টিআইবি জানায়, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা দেশের মানুষ করেছিল, বাস্তব চিত্র এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।
ঘুষ লেনদেন ছাড়িয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেবাখাতে ঘুষ লেনদেনের প্রাক্কলিত মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকারও বেশি। ২০২৩ সালের তুলনায় এ পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থের হিসাবে অতিরিক্ত ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঘুষের অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.২৩ শতাংশ এবং সংশোধিত জাতীয় বাজেটের প্রায় ১.৫৮ শতাংশের সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আর্থিক ক্ষতি শুধু অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং সরকারি সেবার প্রতি জনগণের আস্থাকেও দুর্বল করে।
দুর্নীতির শিকার পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে
জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে দুর্নীতির শিকার হওয়া পরিবারের হার ১৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার বেড়েছে ২৫.২ শতাংশ।
অর্থাৎ, সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক নাগরিক অনিয়ম, হয়রানি এবং আর্থিক লেনদেনের চাপে পড়ছেন।
পাসপোর্ট ও বিআরটিএ সেবায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ
টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগের জরিপগুলোর মতো এবারও পাসপোর্ট সেবা এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
সেবা প্রার্থীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত যাচাই কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করতে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের চাপ তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি সেবা, আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সেবাতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
১৮টি খাতের ওপর পরিচালিত জরিপ
টিআইবি জানায়, দেশের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ খাত ও সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামত সংগ্রহ করে সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; সেবা খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সেবাপ্রদান প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব করা না গেলে দুর্নীতির এই প্রবণতা কমানো কঠিন হবে। ঘুষ ও অনিয়মের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
টিআইবির এই প্রতিবেদন নতুন করে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই নজর থাকবে নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণের।
প্রকাশক ও সম্পাদক: বেঙ্গল টাইমস