দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মহা দূর্নীতিবাজ ৪ প্রকৌশলীর বিদেশযাত্রা ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ
By স্টাফ রিপোর্টার | বেঙ্গল টাইমস
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) চারজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর বিদেশযাত্রা ঠেকাতে একটি গোপন সরকারি চিঠি জারি করেছে।
চিঠিতে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা ওই গোপন চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রশাসনিক তথ্য ও গোয়েন্দা সূত্রে তাদের বিদেশে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে আসায় তদন্তের স্বার্থে সাময়িকভাবে তাদের বিদেশযাত্রা বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সরকারি নথিতে চিঠিটি ‘গোপনীয়’ (Confidential) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তদন্তের স্বার্থেই বিদেশযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ
চিঠিতে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত কোনো কর্মকর্তা বিদেশে চলে গেলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ওপর প্রয়োজনীয় নজরদারি ও বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা বিদেশে চলে যাওয়ার ঘটনার পর সরকার এখন তদন্তাধীন ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে তদন্তের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতেই আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
যাদের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণের অনুরোধ
সরকারি চিঠিতে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন—
- * মো. আনিছুর রহমান — তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
- * কাজী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন — অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী; বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনে সংযুক্ত, পূর্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কর্মরত।
- * মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী — সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
- * ফারজানা সুলতা — সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
চিঠির সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা এবং পাসপোর্ট নম্বরও সংযুক্ত করা হয়েছে, যাতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
যেসব সংস্থাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে
* সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়;
- * অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (স্পেশাল ব্রাঞ্চ);
- * অতিরিক্ত ডিআইজি (ইমিগ্রেশন), বাংলাদেশ পুলিশ;
- * মহাপরিচালক, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর।
- এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার কারসাজি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত জোরদারের পাশাপাশি তদন্তাধীন ব্যক্তিদের দেশত্যাগ ঠেকানোর উদ্যোগ প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ।
তাদের মতে, কোনো তদন্তাধীন ব্যক্তি বিদেশে চলে গেলে তদন্তের গতি মন্থর হতে পারে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদেশযাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিকভাবেও বহুল ব্যবহৃত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন
সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়ে আসছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি দমনে শুধু মামলা দায়ের বা তদন্ত শুরু করাই যথেষ্ট নয়; তদন্তকে কার্যকর ও নিরপেক্ষ রাখতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আইনি প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণ সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থারই একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জনপ্রশাসন ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি তদন্ত প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে—
- * তদন্ত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
- * পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
- * অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর আরোপিত প্রশাসনিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা উচিত।
- * একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক লেনদেনে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর কী?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চিঠি পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা হতে পারে। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে তদন্তের প্রতিটি ধাপে আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।