শিশু হত্যা ও বলাৎকার: রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নাকি সমাজের পতন?
By লেখক ও কলামিস্ট, ড. শবনম জাহান অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
শিশুরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও নিরাপরাধ অংশ। অথচ আজ তারা ঘর, স্কুল, এমনকি নিজের পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ নয়। ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও বহু ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদন্ত কিংবা বিচারহীনতার সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকার বারবার কঠোর অবস্থানের কথা বললেও বাস্তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করেছে। অপরাধীরা জানে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া বা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে শাস্তি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধও থেমে নেই। সরকারের দায়িত্ব শুধু বিবৃতি দেওয়া নয়, বরং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও প্রচারণা না থাকায় শিশুরা সহজেই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধিও অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে সরকার দৃশ্যমান কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় শিশু হত্যার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য ও ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। অথচ প্রতিটি নিহত শিশু একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ। সরকারের দায়িত্ব ছিল শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবতা বলছে—রাষ্ট্র সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক দোষারোপের বাইরে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, কঠোর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও ভয়াবহ হবে। একটি রাষ্ট্র তখনই সফল হয়, যখন তার শিশুরা নিরাপদ থাকে। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সরকারের সাফল্যের সব দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।এদেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তাদের হত্যা করা হয়, বিক্ষোভে উত্তাল হয় দেশ, নতুন হ্যাশট্যাগ আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা ছেয়ে যায় মাতমে। এরপর ধীরে ধীরে সবাই সবকিছু ভুলে যায়। এরপর আরেকটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়। সরকার দায়সারা বিবৃতি দেয়।
বিবৃতির মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম। ভাগ্য প্রসন্ন হলে কখনো কখনো অপরাধী ধরাও পরে। এরপর দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, কখনো কখনো যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায়। কিন্তু বিচার মিলে না। সব স্বপ্ন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো তাদের সন্তানের হত্যাকারী কিংবা ধর্ষণকারীর সাজা দেখে যেতে পারে না। কে বলবে এইদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড?
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য বলছে, ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স ই ১২ বছরের নিচে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পরিবারের পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা আত্মীয় হয়ে থাকে।
মনে পড়ে, মাগুরাতে আছিয়ার ধর্ষণের ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল দেশ। মাগুরায় ধর্ষণের শিকার হয়ে নিহত আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার দাফনে হেলিকপ্টারে করে নেতারা অংশ নিয়েছিল, বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৯০ দিনের মধ্যে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তৎকালীন আইন উপদেষ্টা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভরে গিয়েছিল শোক, নিন্দা আর বিচারের দাবীতে। কিন্তু থেমে থাকেনি কিছুই। আছিয়ার ঘটনার কয়েকমাস পর কাটা গলা নিয়ে সাত বছরের ছোট্ট ইরা একাকী হাঁটছিল সীতাকুন্ডের জঙ্গলে। ধর্ষণ চেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরার গলায় ছুরি চালায় ঘাতক। সেই ইরাকেও বাঁচানো যায়নি। মিরপুরের রামিসা নিজের বাসায় মায়ের খুব কাছে থাকার পরও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
এরপর তাকে হত্যা করা হয়েছে, তার ছোট্ট দেহটি খন্ড বিখন্ড করা হয়েছে। কোথায় নিরাপদ আমাদের শিশুরা! ২০২৪ সালে ৩৩৭ টি এবং ২০২৫ সালে ৬২৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অন্তত ৪৭৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ১৫৩ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। মনে রাখতে হবে এই সংখ্যাগুলো কেবল নিছক একেকটি সংখ্যা নয়। কারণ প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে মিশে আছে একেকটি পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্প।
সে সমাজে অপরাধের সাজা হয় না, সেই সমাজে সহিংসতা ও অপরাধই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এদেশে আইন আছে, কিন্তু বিচার নেই। নীতি আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই। শোক আছে, কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই। খুব জানতে ইচ্ছে করে, আর কত শিশুর লাশ হলে ঘুম ভাঙবে এই রাষ্ট্রের ?
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতি ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা রাখতে হবে । শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে, বিদ্যালয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও জরুরি।
শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।