জাতিসংঘে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক: শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা আরও জোরদারের আহ্বান
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | ৭ জুলাই ২০২৬
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান, বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং নারী শান্তিরক্ষীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (৬ জুলাই) স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্ট (ডিওএস)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারের সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের এস-২৭২৯ নম্বর কক্ষে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের চলমান সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ কন্টিনজেন্টের পরিচালনাগত সহযোগিতা, প্রতিপূরণ (Reimbursement) দ্রুত নিষ্পত্তি, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি (WPS)’ এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট (FPU) মোতায়েনের প্রস্তুতিসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যদের প্রতিপূরণ প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করতে ডিওএস-এর ধারাবাহিক সহযোগিতার জন্য আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারেকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণে ডিওএস-এর পরিবেশ বিভাগের ভূমিকাও প্রশংসা করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনের পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশই বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের সহযোগিতায় মিশন এলাকায় আরও ব্যাপকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বাংলাদেশ কাজ করতে আগ্রহী।
নারী শান্তিরক্ষীদের নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘকে নারী-বান্ধব ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিকূল ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য শান্তিরক্ষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
হাইতির বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পুলিশ ইতোমধ্যে তিনটি অত্যাধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট (Specialized FPU) মোতায়েনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। প্রচলিত ইউনিটের তুলনায় এসব বিশেষায়িত ইউনিটে থাকবে সোয়াত (SWAT), র্যাপিড রেসপন্স প্লাটুন, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ (EOD), ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন ব্যবস্থাপনা, সংগঠিত অপরাধ ও সাইবার অপরাধ তদন্ত, নদীপথে অভিযান এবং মাদকবিরোধী অভিযানে দক্ষ সদস্যরা।
তিনি জানান, হাইতিতে এই বিশেষায়িত সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুলাই জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশের তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সমঝোতা স্মারক (MOU) সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেবে। আলোচনাকে সফল করতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এছাড়া পূর্ণাঙ্গ ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের পাশাপাশি অন্যান্য পুলিশ অবদানকারী দেশের (PCC) স্বনির্ভর ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ টিম বা প্লাটুন মোতায়েনের প্রস্তুতির কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠকের শেষপর্যায়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীল পতাকার অধীনে বাংলাদেশের অটুট অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের পেশাদারিত্ব এবং জাতিসংঘের লজিস্টিক সহায়তার সমন্বয়ে বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও শৃঙ্খলার উচ্চ প্রশংসা করেন।
তিনি পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রণী উদ্যোগেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং হাইতিতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েনসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবে।