বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা, বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমে ৬.৮ শতাংশ
By বাণিজ্য প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমসপ্রকাশ: ৩০ জুন, ২০২৬
ঢাকা: বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এবং নীতি সুদহার (পলিসি রেট) অপরিবর্তিত রেখে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই–ডিসেম্বর) জন্য নতুন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (Monetary Policy Statement-MPS) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। বর্তমান সরকারের অধীনে এবং নতুন গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম মুদ্রানীতি।
পরে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ প্রদানের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ চলতি জানুয়ারি-জুন মেয়াদের জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮.৫ শতাংশ। তবে নির্ধারিত লক্ষ্য কোনো মাসেই অর্জিত হয়নি।
ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের কারণে আগামী ছয় মাসে ৬.৮ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই নতুন মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য। এ নীতির মাধ্যমে দেশের ঋণপ্রবাহ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পদের ব্যবস্থাপনার রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ, যা সরকারি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
নতুন মুদ্রানীতিতে আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (SLF)-এর সুদহার ১১.৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF)-এর সুদহার ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আপাতত এই হার অপরিবর্তিত থাকবে।
মুদ্রানীতি ঘোষণার পর প্রশ্নোত্তর পর্বে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত সুদে ঋণ বিতরণের সুযোগ থাকবে না।
পাশাপাশি গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের বিনিয়োগ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ (এনপিএল) কমানোর বিষয়ে গভর্নর জানান, এ লক্ষ্যে ১৮ মাস মেয়াদি তিন ধাপের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে এক্সিট প্ল্যান, দ্বিতীয় ধাপে অর্থঋণ আদালত আইন বাস্তবায়ন এবং শেষ ধাপে ডিসট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট কার্যকর করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যকর রাখা সরকারের দায়িত্ব। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা প্রধান আর্থিক নীতিগত উপায় হিসেবে নীতি সুদহার উচ্চ পর্যায়ে বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।