হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ৬, ২০২৬

সার্বভৌমত্বের বেদিতে মার্কিন উৎসব: বন্ধুত্ব না আত্মসমর্পণের বিপজ্জনক সমীকরণ

By শঙ্খচিল

15EE8AAB-B514-44E2-AD52-4B0B517DAB61

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদার শেষ সীমারেখা কোথায়? এর উত্তর কোনো বিমূর্ত দর্শনে নয়; তা লিপিবদ্ধ থাকে সংবিধানে এবং প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান—জাতীয় সংসদ ভবনের মর্যাদায়। একটি দেশের স্বাধীনতা কেবল তার ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতীকগুলোর প্রতি তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা শ্রদ্ধাশীল এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটা আপসহীন, তার ওপর।

২০২৬ সালের ৪ জুলাই ঢাকার শেরেবাংলা নগরে যা ঘটেছে, তা অনেকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। আলোকসজ্জা, আনুষ্ঠানিক আয়োজন এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল সেই প্রাঙ্গণ, যা সাধারণভাবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতিতে কোনো দেশের জাতীয় দিবস সাধারণত সেই দেশের দূতাবাস অথবা নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে উদযাপিত হয়। ফলে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে এ ধরনের আয়োজনকে অনেকেই প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন।

এই আয়োজনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, সংসদ ভবনের স্থপতি ছিলেন মার্কিন স্থপতি লুই আই. কান; তাই এটি দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক। তবে সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। লুই কান একজন পেশাদার স্থপতি হিসেবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নকশা প্রণয়ন করেছিলেন; ভবনটি কোনো অনুদান বা উপহার নয়।

তাঁদের প্রশ্ন, তাজমহলের স্থপতি পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন বলে কি সেখানে ইরানের জাতীয় দিবস উদযাপনের অনুমতি দেওয়া হবে? অথবা স্ট্যাচু অব লিবার্টি ফ্রান্সের উপহার হওয়ায় কি যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ফ্রান্সের বাস্তিল দিবস পালন করতে দেবে? তাঁদের মতে, আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রগুলো স্থাপত্যের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে কখনো এক করে দেখে না।

সমালোচকদের আরেকটি বড় আপত্তি ইতিহাসকে ঘিরে। তাঁদের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন মার্কিন নিক্সন–কিসিঞ্জার প্রশাসনের ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে এখনও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

সেই প্রেক্ষাপটে সংসদ ভবনের মতো জাতীয় প্রতীকের ভেতরে মার্কিন স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতার সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের করমর্দনের দৃশ্যকে সমালোচকেরা প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

লেখকের মতে, পুরো ঘটনাটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি মনে করেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতি এমন একটি ধারণা তৈরি করেছে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। কূটনীতির মূল ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান ও সমতা। যদি বাংলাদেশ ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিল বা হোয়াইট হাউসে নিজেদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দিত, তবে তা গ্রহণযোগ্য হতো কি না—এই প্রশ্নও লেখক উত্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, সেই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনকে এ ধরনের আয়োজনের জন্য ব্যবহার করা যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে লেখকের মতে, সেই সম্পর্ক যেন কখনো জাতীয় আত্মমর্যাদা ও রাষ্ট্রের প্রতীকী মর্যাদার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত না হয়। কারণ, জাতীয় সংসদ ভবন কোনো সাধারণ অনুষ্ঠানস্থল নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক।বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং নিজের জাতীয় প্রতীকের প্রতীকী নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, সেটি উপলব্ধি করাই একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের পরিচয়।