হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ১৩, ২০২৬

পরীক্ষা, জনদুর্ভোগ ও নেতৃত্বের পরীক্ষা: শিক্ষামন্ত্রীর কাছে যে প্রশ্নের উত্তর চায় বাংলাদেশ

By নুসরাত জাহান, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী।

IMG_8153

শিক্ষা শুধু পরীক্ষার নাম নয়; শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা, দূরদর্শিতা এবং দায়িত্ববোধেরও প্রতিচ্ছবি। একজন শিক্ষামন্ত্রীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শুধু পরীক্ষার রুটিন ঘোষণা করা নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগ নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে।

কিন্তু যখন প্রকৃতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়, হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবক চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধ্য হন—তখন প্রশ্ন ওঠে, এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত ছিল?চলতি এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনই দেশের বহু স্থানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কোমর কিংবা হাঁটুপানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। মনোযোগী।

অনেক এলাকায় যানবাহন সংকট, দীর্ঘ যানজট, জলাবদ্ধতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পরীক্ষার্থীরা মানসিক চাপ নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। 

পরীক্ষার আগে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল প্রশ্নপত্র নয়, বরং দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ।এমন বাস্তবতায় দেশের মানুষ অন্তত একটি বিষয় প্রত্যাশা করেছিল—শিক্ষামন্ত্রী কিংবা শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কেউ মাঠে উপস্থিত থাকবেন, পরীক্ষার্থীদের খোঁজ নেবেন,

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজন হলে জাতির উদ্দেশে একটি সহানুভূতিশীল বার্তা দেবেন। হয়তো তিনি বলতে পারতেন, “পরিস্থিতি আমাদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল।

তোমাদের কষ্টের জন্য আমরা দুঃখিত। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়া হবে।”এই কয়েকটি বাক্য হয়তো জলাবদ্ধতা দূর করতে পারত না, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত করতে পারত।

কারণ নেতৃত্বের শক্তি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়, মানবিক উপস্থিতিতেও প্রকাশ পায়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই দৃশ্য দেশের মানুষ দেখেনি। বরং একই সময়ে মন্ত্রীকে একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে, শিক্ষা প্রশাসন বাস্তবতার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতায় বেশি।

একজন মন্ত্রী যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন বা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তিনি শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান নন; তিনি সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও প্রতীক।

দুর্যোগের দিনে একটি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলা কিংবা একটি আন্তরিক বার্তা—এসবই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অংশ।এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসে—পরীক্ষা কি সব পরিস্থিতিতেই নির্ধারিত সময়েই হতে হবে? শিক্ষা জীবনে একটি পরীক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জীবন, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতা কি তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? অতীতেও বিভিন্ন দুর্যোগ, মহামারি কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই দায়িত্বশীল প্রশাসনের পরিচয় হতে পারে।শিক্ষানীতি কখনোই কেবল কঠোরতার মাধ্যমে সফল হয় না। সেখানে প্রয়োজন বাস্তবতা, সহমর্মিতা এবং বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। পরীক্ষা আয়োজনের সফলতা শুধু প্রশ্নপত্র সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছেছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে প্রতিটি শিক্ষার্থী সমান সুযোগ ও মানসিক স্বস্তি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে কি না।শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ রয়েছে—এটি ক্রমেই জনসম্পৃক্ততা হারাচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি—এসবের ঘাটতি নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতি সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালো করেছে।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এটি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

ভবিষ্যতে আবহাওয়া, দুর্যোগ এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আরও নমনীয় ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা। একই সঙ্গে সংকটের মুহূর্তে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বকে জনগণের পাশে দৃশ্যমানভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।

একজন শিক্ষামন্ত্রীর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় শুধু পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং তিনি

শিক্ষার্থীদের কষ্ট কতটা উপলব্ধি করেন এবং সংকটের সময়ে কতটা মানবিক নেতৃত্ব দেখাতে পারেন—তার মাধ্যমে।

এই ঘটনার পর জনগণের ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশ্নকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, দায়িত্বশীলতা এবং আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল পরীক্ষা নয়—মানুষের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে, তা পুনরুদ্ধার করাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।