১৭ মে : বাংলার আকাশে ফিরে আসা এক আলোর নাম — শেখ হাসিনা
By কৃষিবিদ দীপু লেখক - পেশাজীবি ও কলামিস্ট।
১৯৮১ সালের ১৭ মে কোন রোদজ্জ্বল দিন ছিলনা।ঝড়বৃষ্টিময় দিনে মাতৃসম নেত্রীর আগমন হয়েছিল এদেশে। বাংলা মা যেন আনন্দাশ্রু চালছিল অঝোড় ধারায় তার সন্তানকে কাছে পেয়ে। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো লাখো জনতা, সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন প্রিয় নেত্রীকে স্বাগত জানাতে। বাবা, মা, ভাই, ভাবী সকলকে হারিয়ে, প্রাণপ্রিয় বাংলাকে লাখো শহীদের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসাবে গড়তে শেখ হাসিনা ছুটে এসেছিলেন দেশের টানে, সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে।
১৭ মে শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ছিল না, সেদিন যেন বহুদিন ধরে অন্ধকারে ডুবে থাকা বাংলার আকাশে আবার নতুন সূর্য উঠেছিল। ইতিহাসের পাতায় কিছু দিন আসে, যেগুলো শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির কান্না, বেদনা, আশা আর পুনর্জন্মের প্রতীক হয়ে। ১৭ মে তেমনই একটি দিন। কারণ সেই দিন দেশে ফিরেছিলেন এমন এক নারী, যিনি শুধু বঙ্গবন্ধুর কন্যা নন, তিনি ছিলেন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শেষ আশ্রয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে শুধু একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়নি; হত্যা করা হয়েছিল একটি জাতির স্বপ্নকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে আবার পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল, ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছিল, রাজাকার-আলবদরদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল। বাংলার আকাশ থেকে যেন হঠাৎ করেই আলো নিভে গিয়েছিল। সেই ভয়ংকর সময়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলেই বেঁচে যান। কিন্তু বেঁচে থাকাও তখন এক নির্মম যন্ত্রণা। কারণ একটি মানুষ যখন একদিনে বাবা-মা, ভাই, আত্মীয়স্বজন—নিজের পুরো পরিবার হারায়, তখন তার বেঁচে থাকাটাও এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায়।
তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয় বছর। নির্বাসনের জীবন, বুকভরা শোক আর চোখভরা অশ্রু নিয়ে শেখ হাসিনা ফিরে এলেন বাংলার মাটিতে। সেদিন প্রবল ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ছুটে গিয়েছিল বিমানবন্দরে। মানুষ শুধু একজন নেত্রীকে দেখতে যায়নি; মানুষ যেন ফিরে পেয়েছিল হারিয়ে যাওয়া সাহস। তারা অনুভব করেছিল—বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যায়নি, তাঁর স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে তাঁর কন্যার মধ্যে।
সেদিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমি আপনাদের নেতা হতে আসিনি, আমি আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে এসেছি।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর পুরো রাজনৈতিক দর্শন। ক্ষমতা নয়, মানুষের ভালোবাসাই ছিল তাঁর শক্তি। প্রতিশোধ নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
তারপরের ইতিহাস এক অবিশ্বাস্য সংগ্রামের ইতিহাস। বারবার হত্যা চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, কারাবরণ, আন্তর্জাতিক চাপ—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন এক নতুন উচ্চতায়। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজনৈতিক নেতার জীবনেই এত আঘাত এসেছে, অথচ তিনি এত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশকে বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। বিদ্যুতের জন্য মানুষ হাহাকার করত। সন্ধ্যা নামলেই গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যেত। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত, অর্থনীতি ছিল দুর্বল। সেই বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন শেখ হাসিনা। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন।
আজ পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যখন গাড়ি ছুটে চলে, তখন সেটি শুধু একটি সেতু পার হওয়া নয়; সেটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা পার হয়ে যাওয়ার গল্প। বিশ্বব্যাংক যখন সরে দাঁড়াল, যখন চারদিকে বলা হচ্ছিল—“বাংলাদেশ পারবে না”, তখন শেখ হাসিনা বুক উঁচু করে বলেছিলেন, “আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করব।” তিনি করেছিলেনও। কারণ তিনি জানতেন, আত্মবিশ্বাস হারালে একটি জাতি বাঁচতে পারে না। পদ্মা সেতু তাই শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি বাঙালির সাহসের প্রতীক।
ঢাকার আকাশে আজ মেট্রোরেলের শব্দ শোনা যায়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শহরের ব্যস্ততাকে নতুন গতি দিয়েছে। একসময় যানজটে থেমে থাকা শহর আজ আধুনিক নগরীর রূপ পেয়েছে। কর্ণফুলী টানেল সমুদ্রপারের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত খুলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ শুধু একটি স্লোগান ছিল না; এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।
যে বাংলাদেশ একদিন খাদ্য ঘাটতির জন্য পরিচিত ছিল, সেই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যে মানুষগুলো বছরের পর বছর নদীভাঙনে, দারিদ্র্যে, ঝড়ে-জলোচ্ছ্বাসে সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটিয়েছে, তারা আজ আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিজেদের ঘর পেয়েছে। শেখ হাসিনা শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন নির্মাণ করেননি; তিনি মানুষের ভাঙা জীবন জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছেন।
করোনা মহামারির সময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোও যখন দিশেহারা, তখন বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ বিনামূল্যে টিকা পেয়েছে। গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক, শহরের রিকশাচালক, গার্মেন্টস কর্মী, দিনমজুর—সবাই টিকা পেয়েছে রাষ্ট্রের টাকায়। সেই কঠিন সময়ে শেখ হাসিনা শুধু সরকারপ্রধান ছিলেন না; তিনি যেন মায়ের মতো আগলে রেখেছিলেন পুরো দেশকে।
আজ যারা রাতের অন্ধকারে গ্রামের ঘরে জ্বলা বৈদ্যুতিক বাতি দেখে, যারা পদ্মা সেতু পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টার পথ কয়েক মিনিটে অতিক্রম করে, যারা মেট্রোরেলে চড়ে সময় বাঁচায়, যারা নিজের ঘরের চাবি হাতে পায়—তারা হয়তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শেখ হাসিনার উন্নয়নের ছোঁয়া অনুভব করে। কারণ উন্নয়ন শুধু কংক্রিটের দেয়াল নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের চোখে স্বপ্ন ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। যে মানুষ সারাজীবন একটি দেশকে গড়তে নিজের জীবন উৎসর্গ করে, অনেক সময় তাকেই সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। তবু সত্যকে মুছে ফেলা যায় না। পদ্মা সেতু মুছে ফেলা যায় না। মেট্রোরেলের শব্দ থামিয়ে দেওয়া যায় না। গ্রামের ঘরে জ্বলা আলো নিভিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষের মনে জেগে ওঠা আত্মবিশ্বাস মুছে দেওয়া যায় না।
১৭ মে তাই শুধু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন নয়। এটি একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। এটি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তোলার দিন। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি নিজের ব্যক্তিগত শোক ভুলে কোটি মানুষের হাসির জন্য লড়াই করেছেন।
যতদিন বাংলার আকাশে লাল-সবুজের পতাকা উড়বে, যতদিন বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ততদিন ১৭ মে শুধু একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে থাকবে আশা ফিরে পাওয়ার দিন, সাহস ফিরে পাওয়ার দিন, আর বাংলার মানুষের হৃদয়ে ফিরে আসা এক আলোর নাম—শেখ হাসিনার দিন।
কৃষিবিদ দীপু লেখক - পেশাজীবি ও কলামিস্ট।