হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ১, ২০২৬

স্মৃতির এক দশক: হোলি আর্টিজানের সেই রক্তাক্ত রাত, আজও মুছে যায়নি ক্ষত

By বিশেষ প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস

734f6463-848c-4d29-be00-94b37116205e

ঢাকা: দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ এক দশক। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে রাজধানীর গুলশানের সেই লেকপাড়ের দৃশ্যপট। ২০১৬ সালের ১ জুলাই যে হোলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই—এই মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি।

আজ ১ জুলাই ২০২৬; বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো।এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক, স্বজন হারানোর বেদনা, বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং শিক্ষিত তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি আজও দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।

ফিরে দেখা: ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই কালরাত

২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার এবং পবিত্র রমজান মাস। ঈদের কেনাকাটা ও ছুটির আমেজে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে অবস্থিত অভিজাত হোলি আর্টিজান বেকারি দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। অস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন উগ্রপন্থী তরুণ রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে জিম্মি সংকট সৃষ্টি করে।

খবর পেয়ে প্রথম দফায় উদ্ধার অভিযানে গিয়ে হামলাকারীদের গুলি ও বিস্ফোরণে শহীদ হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। এরপর পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী, র‍্যাব, পুলিশ, সোয়াট ও বিজিবি। রাতভর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করে দেশবাসী।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ ও রক্তাক্ত পরিণতি

পরদিন ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা ভেতরে প্রবেশ করেন। মাত্র ১২ মিনিটের অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

কিন্তু ততক্ষণে রেস্তোরাঁর ভেতরে ঘটে গেছে এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। উদ্ধার করা হয় ২০ জন নিরপরাধ জিম্মির মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—

* ৯ জন ইতালীয় নাগরিক* ৭ জন জাপানি নাগরিক* ১ জন ভারতীয় নাগরিক (তারিশি জৈন)* ৩ জন বাংলাদেশি (ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ)

  • পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জনে। এ হামলা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
  • শিক্ষিত তরুণদের উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার সতর্কবার্তা
  • হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের সমাজকে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ তরুণ—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল—অনেকে সচ্ছল পরিবারের সন্তান এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
  • তদন্তে উঠে আসে, তারা দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে উগ্রবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে গোপনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে, শুধু দারিদ্র্য বা শিক্ষার অভাব নয়; অনলাইন র‌্যাডিক্যালাইজেশন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরমপন্থী প্রচারণাও তরুণদের সহিংসতার পথে ঠেলে দিতে পারে।

আইএসের দায় স্বীকার বনাম সরকারি অবস্থান

হামলার পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) তাদের প্রচারমাধ্যম ‘আমাক’-এর মাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করে। তবে বাংলাদেশ সরকার জানায়, দেশে আইএসের সাংগঠনিক উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ঘটনাটি দেশীয় জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র পরিকল্পিত হামলা। তদন্তে তামিম চৌধুরীকে হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

বিচার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

হামলার পর নব্য জেএমবির নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দেশজুড়ে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে তামিম চৌধুরীসহ সংগঠনের অনেক সদস্য নিহত বা গ্রেপ্তার হন।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ওই দণ্ড পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলার বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়।

এক দশক পরও প্রাসঙ্গিক যে শিক্ষা

হোলি আর্টিজান হামলা শুধু একটি জঙ্গি হামলা নয়;

এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি এবং উগ্রবাদবিরোধী নীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।

 গত এক দশকে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন,

সহিংস উগ্রবাদ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম এবং সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা অপরিহার্য।

১০ বছর পরও হোলি আর্টিজানের

সেই রক্তাক্ত রাত স্মরণ করিয়ে দেয়—উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সতর্কতা,

মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার সংগ্রাম কখনোই শেষ হয়ে যায় না।