যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুলের’ খেসারত ২৯০ প্রাণ: ক্ষতিপূরণ দিলেও মেলেনি ক্ষমা, শাস্তির বদলে জুটেছিল পদক
By অনিন্দ্য সাইমুম | বেঙ্গল টাইমস ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬
১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই। ইরান–ইরাক যুদ্ধের উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে বিশ্বের অন্যতম মর্মান্তিক বেসামরিক বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী হয় মধ্যপ্রাচ্য। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ভূপাতিত হয় ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫। এতে বিমানটির ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন, যাদের মধ্যে ৬৬ জন ছিল শিশু।
মাত্র সাত মিনিটেই শেষ হয়ে যায় ২৯০ প্রাণের যাত্রা
১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই সকালে ইরানের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই অভিমুখে উড্ডয়ন করে ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫।
একটি এয়ারবাস এ-৩০০ উড়োজাহাজে ছিলেন ২৭৪ জন যাত্রী ও ১৬ জন ক্রু সদস্য।সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে উড্ডয়নের মাত্র সাত মিনিট পর, ১০টা ৫৪ মিনিটে, হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স থেকে ছোড়া দুটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বিমানটিতে আঘাত হানে। মুহূর্তেই উড়োজাহাজটি আকাশে ভেঙে সাগরে বিধ্বস্ত হয়। এতে সব ২৯০ আরোহী নিহত হন।
রাডারের ভুল, নাকি ভয়াবহ সিদ্ধান্ত?
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানায়, ওই সময় ইরানি গানবোটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িত ছিল ইউএসএস ভিনসেন্স।
তাদের দাবি, রাডারে দেখা বিমানটিকে ভুলবশত ইরানের এফ-১৪ যুদ্ধবিমান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র আরও দাবি করে, বিমানটিকে একাধিকবার সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে, বিমানটি অনুমোদিত বাণিজ্যিক রুটেই স্বাভাবিকভাবে উড্ডয়ন করছিল এবং নির্ধারিত উচ্চতায় উঠছিল। এটি কোনোভাবেই যুদ্ধবিমান ছিল না।
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি পরে এই ঘটনাকে ‘ঠান্ডা মাথায় সংঘটিত বড় অপরাধ’ বলে অভিহিত করেন।
ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা নয়১৯৮৯ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করে ইরান।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ১৯৯৬ সালে আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি হয়। সমঝোতা অনুযায়ী, নিহতদের পরিবার এবং ধ্বংস হওয়া উড়োজাহাজের ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (৯৫ মিলিয়ন ডলার) প্রদান করে। এর বিনিময়ে ইরান মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ‘গভীর দুঃখ’ (deep regret) প্রকাশ করলেও, আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি।
শাস্তির বদলে জুটেছিল সামরিক পদকঘটনার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল ইউএসএস ভিনসেন্সের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সি. রজার্স তৃতীয়ের পরিণতি।
এত বড় প্রাণহানির ঘটনার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ১৯৯০ সালে তাঁকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্মানজনক ‘লিজিয়ন অব মেরিট’ পদকে ভূষিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল তাঁর ‘অসামান্য দায়িত্ব পালনের’ স্বীকৃতি।
এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন এবং বহু পর্যবেক্ষকের তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
আজও স্মরণ করা হয় নিহতদের
আইনি বিরোধের অবসান ঘটলেও ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর ট্র্যাজেডি এখনো ইরানের জাতীয় স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে আছে।প্রতি বছর ৩ জুলাই, হরমুজ প্রণালির জলে ফুল ভাসিয়ে নিহত ২৯০ আরোহীর স্মরণে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাদের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, আর এই ঘটনাকে এখনো আধুনিক বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।